default-image

২০১৯ সালের ১৯ মার্চ। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রেলগেট হরিজনপল্লিতে চলছিল বিয়ের অনুষ্ঠান। আনন্দ বাড়াতে অনুষ্ঠানে মদপান করেন অনেকে। অতিরিক্ত মদপানে মারা যান বাবা রমেশ (৬০) ও ছেলে সোহাগ (২৭)। এর কয়েক দিন পরই ওই বছর ৭ এপ্রিল উপজেলার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত রুশ নাগরিক দিমিত্রি (৪১) স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছ থেকে মদ কিনে পান করেন। অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি মারা যান।

একই বছর ১৯ মে জেলার ফরিদপুর উপজেলার দক্ষিণ টিয়ারপাড়া গ্রামে ফরিদুল ইসলাম (২৫) ও রাউত নাগদাপাড়া গ্রামে জামাল হোসেন (৪০) এবং ১০ জুন ঈশ্বরদী উপজেলার লোকসেড এলাকায় সজল (৩২) ও রাজু (৩৫) নামের দুই বন্ধু মারা যান। অভিযোগ ওঠে, তাঁরা হোমিওপ্যাথির দোকান থেকে স্পিরিট সংগ্রহ করে পান করেছিলেন।

চলতি বছর একই ধরনের আরও দুটি ঘটনা ঘটে পাবনায়। একটি বেড়া উপজেলার মাশুমদিয়া ইউনিয়নের কাজী শরিফপুর ও অপরটি সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম সাহাপাড়া গ্রামে। কাজী শরিফপুরে ঈদুল ফিতরের রাতে অসুস্থ হয়ে মারা যান সবুজ হোসেন (২০) নামের এক তরুণ এবং বনগ্রামে অসুস্থ হয়ে মারা যান কলেজপড়ুয়া দুই বন্ধু। প্রতিটি ঘটনায় অভিযোগ ওঠে মদপানে মৃত্যুর।

পাবনার ৯ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে প্রায়ই এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যার কিছু প্রকাশ পায়, কিছু লোকলজ্জার ভয়ে আড়াল হয়ে যায়। এসব মৃত্যুর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে জেলায় মাদকের ভয়াবহতা।

বিজ্ঞাপন

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একটি সূত্রের দাবি, হোমিওপ্যাথির ওষুধের সঙ্গে মেশানোর নামে জেলায় প্রচুর পরিমাণে রেক্টিফাইড স্পিরিট আমদানি হয়। পরে তা মাদক হিসেবে বিক্রি হয়ে থাকে। আর এই স্পিরিট অতিরিক্ত পান করলেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর অভিযান চালিয়ে ৭৫০ লিটার ও ২ হাজার লিটারের দুটি চালান জব্দ করেছে। ঘটনায় দুটি মামলাও হয়েছে। তবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন স্পিরিট আমদানির সঙ্গে জড়িত মূল হোতারা।

স্পিরিট পানে মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যার কিছু প্রকাশ পায়, কিছু লোকলজ্জার ভয়ে আড়াল হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে পাবনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক চিকিৎসক নাজির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে দুই ধরনের স্পিরিট রয়েছে। হোমিওপ্যাথিতে ব্যবহৃত স্পিরিটকে বলা হয় ইথাইল অ্যালকোহল বা ইথানল, যা ক্ষতিকর নয়। পৃথকভাবে আমদানি করে ওষুধে মেশানোরও প্রয়োজন হয় না। ওষুধকে প্রিজার্ভ (সংরক্ষণ) করার জন্য প্রতিটি বোতলে পরিমাণমতো মেশানোই থাকে। হোমিওপ্যাথির নামে যদি কিছু আমদানি হয়ে থাকে, তবে সেটা মিথাইল অ্যালকোহল, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এই অ্যালকোহল সাধারণত রঙে ব্যবহার হয়। এই অ্যালকোহল পান করলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে মৃত্যু হতে পারে।

ঈশ্বরদীতে মদপানে মৃত্যুর ঘটনা বেশি

পুলিশ সুপারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের আগস্ট মাস পর্যন্ত সর্বশেষ এক বছরে জেলায় বিভিন্ন ধরনের মদপানে ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আটজন জেলার ঈশ্বরদীর বিভিন্ন প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিক। মদপানে মৃত্যুর এসব ঘটনায় তিনটি নিয়মিত মামলা হয়েছে। অন্য ঘটনাগুলোতে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) ও অপমৃত্যুর (ইউডি) মামলা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে পাবনার পুলিশ সুপার শেখ রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলার মধ্যে ঈশ্বরদীতে মদপানে মৃত্যুর ঘটনা বেশি। মাদক নির্মূলে উপজেলাটির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি এক অভিযানে ঈশ্বরদী থেকে প্রায় ২০০ লিটার চোলাই মদ জব্দ করা হয়েছে। জেলাকে মাদকমুক্ত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

ঈশ্বরদীতে মদপানে মৃত্যুর ঘটনা বেশি। মাদক নির্মূলে উপজেলাটির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
শেখ রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সুপার, পাবনা

বিষয়টি নিশ্চিত করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপপরিদর্শক আফজাল হোসেন বলেন, ‘রেক্টিফাইড স্পিরিটের অপব্যবহার ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আমরা সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছি। এসব মাদক আমদানির নেপথ্যে থাকা বড় হোতাদের ধরার চেষ্টা চলছে। তাঁদের আইনের আওতায় আনা গেলে জেলার মাদক পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসবে।’

বিজ্ঞাপন

ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজাও আসছে পাবনায়

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ছাড়াও জেলায় মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে জেলা পুলিশ ও র‍্যাব। তিনটি দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ক্ষতিকর অ্যালকোহলের পাশাপাশি জেলায় ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা ও হেরোইনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। টেকনাফ থেকে বিভিন্ন রুটে ইয়াবার বড় চালান পাবনায় আসছে। ট্রানজিট রুট হিসেবে পাবনাকে ব্যবহার করে এসব চালান চলে যাচ্ছে উত্তর ও দক্ষিণের বিভিন্ন জেলায়। এ ছাড়া উত্তরের বুড়িমারী ও লালমনিরহাট হয়ে ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজা আসছে পাবনায়। সম্প্রতি র‍্যাব অভিযান চালিয়ে প্রায় ২০০ কেজি গাঁজার এমন বড় ৩টি চালান জব্দ করেছে। প্রায় প্রতিদিনই ফেনসিডিল, ইয়াবা ও হেরোইনের ছোট ছোট চালান জব্দ ও মাদক ক্রেতা-বিক্রেতাদের আটক করছে তারা।

মাদক কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলা পুলিশ জেলার ৯ উপজেলার ১১টি থানায় প্রতি মাসে ১০ থেকে ১২টি পর্যন্ত মামলা করছে। অন্যদিকে র‍্যাব প্রতি মাসে ২৪ থেকে ২৬টি পর্যন্ত এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রতি মাসে ২৫ থেকে ২৭টি মাদকের মামলা করছে। এতে জেলায় প্রতিদিন গড়ে ছয়টি করে মাদকের মামলা হচ্ছে।

মন্তব্য পড়ুন 0