default-image

প্রতিদিনের মতো শনিবার সকালেও পঞ্চগড় শহরসংলগ্ন করতোয়া নদীতে নুড়িপাথর সংগ্রহ করতে নেমেছিলেন শ্রমিক সফিকুল ইসলাম (৪৯)। হিমেল বাতাস আর কুয়াশার মধ্যেও পেটের তাগিতে পানিতে নামতে হয়েছে তাঁকে। সফিকুল বললেন, ‘মনে হচ্ছে বরফ গলা পানিতে নেমেছি। ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। প্রতিদিনই পাথর তুলতে নদীতে নামি কিন্তু আজকের মতো ঠান্ডা লাগেনি। আজ আর বেশিক্ষণ থাকা যাবে না।’

উত্তরের জেলাগুলোতে শীত জেঁকে বসায় বিপাকে পড়েছেন পঞ্চগড় পৌরসভার নিমনগর এলাকার সফিকুল ইসলামের মতো নানা শ্রেণি-পেশার খেটে খাওয়া মানুষ। কয়েক দিন ধরে দিনের বেলা স্বল্প সময়ের জন্য রোদের দেখা মিললেও শনিবার সারা দিনে দেখা মেলেনি সূর্যের। এতে দিনের সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গিয়ে প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে।

শনিবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বেলা ৩টায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় মাত্র ১৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শনিবার দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল সিলেটের শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর আগে গত শুক্রবার সকাল ৯টায় পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৮ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওই দিন বিকেলে তেঁতুলিয়ায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ঠাকুরগাঁওয়ে রাতে শীতের সঙ্গে কুয়াশা আর বেলা বাড়লে আলোঝলমলে সূর্যের আলো। সন্ধ্যায় হিমেল হালকা বাতাস। এভাবেই চলছিল পুরো পৌষ মাস। কিন্তু শুক্রবার পয়লা মাঘ থেকে জেঁকে বসেছে শীত। হঠাৎ চলে আসা ঠান্ডার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে মানুষ।

default-image

গতকাল শুক্রবার সকালে হঠাৎ করে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় চারপাশ। যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চালাচল করতে শুরু করে। পরে বেলা ১১টার দিকে কুয়াশা ভেদ করে আকাশে সূর্য উঁকি দেয়। আজ শনিবারও সকাল থেকে কুয়াশায় ঢেকে যায় প্রকৃতি, সঙ্গে বইতে থাকে হিমেল বাতাস। দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সূর্যের দেখা মেলেনি।

বিজ্ঞাপন

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার দেওগাঁও, ভাতগাঁও, বরুণাগাঁও ও নারগুন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিক কুয়াশায় ঢাকা। রাস্তায় লোকজনের চলাচল নেই বললেই চলে। প্রচণ্ড ঠান্ডায় তাঁরা কাজে যেতে পারেননি। খড়কুটো জ্বালিয়ে কেউ কেউ আগুন পোহাচ্ছেন। চট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে গবাদিপশুর শরীর।

default-image

সদর উপজেলার দেওগাঁও গ্রামের বাসিন্দা হযরত আলী বলেন, শীত আর বাতাসে বাড়ির বাইরে যাওয়া যায় না। কৃষিশ্রমিক সহিদুল ইসলাম বলেন, হাড়কাঁপানো শীত। সবাই কষ্টে আছে। অনেকে খড় জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। উপজেলা সদরের সালন্দর এলাকার নির্মাণশ্রমিক সুলতানা বেগম (৪৯) বলেন, ‘শীতে বাড়ির বাহির হওয়াই কঠিন। এই শীতে কাজ করব কেমন করে। শীতের জন্য বেকার বসে আছি।’

পঞ্চগড়ের পাথরশ্রমিক শহিদুল ইসলাম (৩২) বলেন, দুই দিন ধরে অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে নদীতে বেশিক্ষণ থাকতে পারছেন না। এ জন্য আয়ও কম হচ্ছে। সদর উপজেলার মীরগড় এলাকার ভ্যানচালক আবদুল মজিদ বলেন, ঠান্ডার কারণে লোকজন কম বের হয়েছে। এতে ভ্যানের যাত্রী কম পাচ্ছেন। বাতাসে বাইরে থাকাও যাচ্ছে না। যাত্রী না পাওয়ায় আয়-রোজগার কমে গেছে।

পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে উত্তরের হিমেল বাতাস বয়ে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। দিনের বেলা রোদ না থাকায় সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেছে।

এদিকে অতিরিক্ত শীতের কারণে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলায় শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হলেও কেউ কেউ বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়ে বাড়িতে ফিরছেন।

পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালের শিশুবিষয়ক চিকিৎসক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, কয়েক দিন ধরে শিশুরা শীতজনিত সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসছে। শনিবার বিকেল পর্যন্ত ২৫ শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। এদের মধ্যে ২০ জনই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। তিনি বলেন, শীতে শিশুদের গরম কাপড়ে ঢেকে রাখতে হবে। তাদের নিয়ে বাইরে বের হওয়া যবে না। এ ছাড়া শিশুদের বাসি খাবার দেওয়া যাবে না।

ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক রাকিবুল ইসলাম জানান, শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে শুক্র ও শনিবার সকালে কয়েকজন বয়স্ক মানুষ হাসপাতালে এসেছেন। এ ছাড়া ১১০ শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল শাহ প্রথম আলোকে বলেন, পঞ্চগড় জেলার ওপর দিয়ে উত্তরের হিমেল বাতাস বয়ে যাওয়ায় শীতের তীব্রতা বেড়েছে। দিনের বেলা রোদ না থাকায় সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেছে। আগামী দুই-তিন দিন এই এলাকায় এমন আবহাওয়া অব্যাহত থাকতে পারে বলে তিনি জানান।

কুড়িগ্রামে মৃদু শৈত্যপ্রবাহে চরম দুর্ভোগে পড়েছে মানুষ। ঘন কুয়াশার সঙ্গে প্রচণ্ড হিমেল হওয়া শীতের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। গত চার দিন জেলায় সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। নিম্ন আয়ের মানুষজন খড়কুটায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। গরম কাপড়ের অভাবে তীব্র শীতে ভুগছে হতদরিদ্র পরিবারের শিশু ও বৃদ্ধরা। শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ শীতজনিত নানা রোগে।

default-image

স্থানীয় কৃষি অফিসের আবহাওয়া পর্যবেক্ষক সুবল চন্দ্র জানান, জেলার ওপর ঘন কুয়াশার মেঘ থাকায় সূর্য উত্তাপ ছড়াতে পারছে না। শনিবার সকালে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক কে এম কামরুজ্জামান সেলিম বলেন, শীতার্ত মানুষের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কম্বল বিতরণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও কম্বল আর শীতবস্ত্র বিতরণ করছে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সফি খান, ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি মজিবর রহমান খান ও পঞ্চগড় প্রতিনিধি রাজিউর রহমান]

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন