বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আসাদ বলেন, ‘গত বছর লাভ করিলাম। তিন বিঘে চাষ কইরে চার লাখ টাকা বেচিলাম। সেই হিসেবে এবার একটু বাড়ায়ে করিছি। এখানে দেড় বিঘার তরমুজ আনছি। এখনো তিন বিঘার মাল ধরা। আমার মতো মানষির এক লাখের বেশি টাকা দেনা মানে বুঝতি পারতিছেন। মাথা তো উল্টাপাল্টা হইয়ে যাচ্ছে। এই দেনা শোধ করতি হইলি যাইতে হবে বোম্বে।’

হতাশা আর বিরক্তি নিয়ে আসাদ বলেন, ‘এলাকায় ব্যাপারী না ঢোকায় মোকামে ফোন দিছি। মোকাম থেকে বলেছে, “মাল নিয়ে আসেন।” আনার পর বলতেছে, “এ মাল এখন চলবে না।” আমরা কী করে বাঁচপো। বাড়িতে গেলেই পাওনাদাররা ধরে বলবে, “মাল বিক্রি করতে নিয়ে গেছো, টাকা দেও, টাকা দেও। আমাগে এখন পলান দিতি হবে।”’

একটু কী যেন চিন্তা করে আসাদ গাজী আবার বলেন, ‘অবশ্য উপায় একটা বের করে ফেলিছি। বাড়িতে গিয়ে পরিবাররে বলব, “তোমারা কাজকাম কইরে সংসার চালাও। আর আমি বাইরে কোথাও গিয়ে কাজটাজ কইরে টাকা আইনে শোধ দিই।”’

আসাদের সঙ্গে যেখানে কথা হচ্ছিল, তখন কয়েক হাত দূরে বিষণ্ন মুখে একরাশ তরমুজের দিকে চেয়ে ছিলেন অনাথ টিকাদার (৫০)। অনাথের বাড়ি খুলনার পাইকগাছার দেলুটি ইউনিয়নের ফুলবাড়ী গ্রামে।
অনাথের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, অনাথের নিজের ১০ কাঠা জমি আছে। বছরের বেশির ভাগ সময় কৈয়াবাজারে শ্রম বিক্রি করেন। গত বছর দুই বিঘা জমিতে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন। এবার ৩ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে তরমুজ করেছেন। টানা আড়াই মাস নিজে ও পরিবারের সদস্যরা শ্রম দিয়েছেন। তিনি ৯০০টি তরমুজ নিয়ে আড়তে এসেছেন তিন দিন আগে। এখন পর্যন্ত ২০০টি তরমুজ বিক্রি হয়েছে।

অনাথ বলেন, ‘এবার বীজ খারাপ ছিল। ফল ভালো হয়নি। অনেক গাছে ফল ধরেনি। আবার অসম্ভব খরা গেছে। জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। পানি দিয়ে কুলাতে পারিনি। হাজের তিনেক ফল থেকে বেছে বেছে ৯০০ তরমুজ এনেছি। ৪ থেকে ৬ কেজি সাইজের ২০০ তরমুজ ২২ টাকা করে বিক্রি করতে পেরেছি।’

তিন দিন ধরে কোনোমতে হোটেলে চারটে খাওয়া জুটলেও নাওয়া-ঘুম ঠিকমতো হয়নি অনাথের। তিনি বলেন, ‘তিন দিন হয়ে গেল। সারা দিন এখানে বসে থাকি। ভৈরর নদীর লঞ্চঘাটের পন্টুনে রাতে ঘুমানোর সময় থাকছি। তিন দিন এক কাপড়ে আছি। হোটেলে একেকবারে একেক শ টাকা খাওয়া খরচ। বিক্রি হওয়ার আশাও দেখছি না। লাভ তো হবেই না। বাড়িতে ফেরার জন্য বাড়ি থেকে বিকাশ করে টাকা পাঠাতে বলা লাগতে পারে।’

কথা বলার সময় খুলনার বিভিন্ন উপজেলার আরও অন্তত ১০ চাষি যোগ দেন। তাঁদের একজন ডুমুরিয়ার শরাফপুরের আকড়া গ্রামের কুদ্দুস গাজী বলেন, এখানে সারা রাত বসে ছিলাম। চোখে চোখে রাখতে পারিনি। মশা আর গন্ধে বসাও যায় না। আবার এখানে তো আনার খরচই উঠবে না। যদি কেজিতে সাত-আট টাকা পেতাম, তাহলে খরচ উঠে কিছু লাভ থাকত। এখন মাঠে যা আছে, তা আর আনার চেষ্টাও করব না। খরচ দিয়ে পারা যাবে না।

আসাদ, অনাথ, কুদ্দুসের মতো হাজারো তরমুজচাষির কাঁধে এখন কষ্টের ভার। হঠাৎ দরপতনে তরমুজ নিয়ে স্বপ্ন দেখা চাষিদের চোখেমুখে হতাশার ছাপ। এদিকে ঘূর্ণিঝড় ‘অশনি’ চোখ রাঙাতে শুরু করায় বেশির ভাগই খরচের টাকা তুলতে পারা না পারাটা এখন ছেড়ে দিয়েছেন ভাগ্যের ওপর।

দাকোপের এক কৃষক মনোতোষ রায় বলেন, ‘আমরা তো এবার নানা কারণে মার খেলাম। বড় ক্ষতি হয়েছে গত বছরের দাম। গত বছর এমন দামে বিক্রি হয়েছিল যে এবারও আমরা ভেবেছিলাম, ভালো দাম পাব। এ জন্য প্রথম দিকে কম দামে আমরা খেত ছাড়িনি। এখন তো ওই টাকাও পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া আমাদের এ পরিস্থিতির জন্য অনেকটা দায়ী মোকামের ঘরওয়ালারা। তাঁরা যা দাম বলে আনছেন, এসে দেখি উল্টা।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন