default-image

অরুণ কুমার বসাক। ইমেরিটাস অধ্যাপক। প্রবীণ এই পদার্থবিদের দিনের পুরোটা সময় কাটে বিভাগের গবেষণাগারেই। তাঁর গবেষণা ছাপা হয় নামী সব জার্নালে। শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি নিয়েও তিনি লিখেছেন বিভিন্ন সময়ে। এসব প্রবন্ধের সংকলন মলাটবদ্ধভাবে বেরিয়েছে বই আকারে। নাম ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মানবতা’।

এই বইয়ের প্রকাশনা উৎসব হয়ে গেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবনে। আজ সোমবার বেলা ১১টায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রবীণ এই শিক্ষক নিজেকে লেখক হিসেবে পরিচয় দিতে ‘লজ্জা’ পেলেও আলোচকেরা করেছেন ভূয়সী প্রশংসা। বইটিকে একটি ‘মূল্যবান দলিল’ বলেও অভিহিত করেছেন বক্তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘চিহ্ন’ বইটি প্রকাশ করেছে। ‘বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মানবতা’ শীর্ষক এই গ্রন্থে অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাকের শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে লিখিত ৩৪টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। অনুষ্ঠানে অতিথিবৃন্দ গ্রন্থটির মোড়ক উন্মোচন করেন।

অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম সাইদুর রহমান খান বলেন, ‘এই বই একটি মূল্যবান দলিল। আমি মনে করি, মানবতা এই বইয়ের সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। মানবতা যেখানে নেই, সেখানে শিক্ষা নিয়েই কী হবে, না নিয়েই কী হবে বা ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট দিয়ে কী হবে। আমরা পত্রপত্রিকা, টিভিতে দেখি খুনোখুনির বীভৎস চিত্র।’ নৈতিকতা শিক্ষার এখন বড় প্রয়োজন উল্লেখ করে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘সিনিয়র শিক্ষকেরা জানেন, আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মানে কেমন ছিলেন, আর এখন টিটকারি মারে। একজন সাবেক শিক্ষক হিসেবে এটা আমার গায়েও লাগে। আসুন, আমরা সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে মানবতাবোধ জাগ্রত করার চেষ্টা করি।’

ষাটের দশক থেকে শিক্ষার্থীদের মান তিলে তিলে হ্রাস পেয়ে আশির দশক থেকে ধস নামতে থাকে। শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে আসে, কিন্তু তাদের বহুবিধ সমস্যা। অঙ্ক মুখস্থ করে, বাংলা কথাও বোঝে না।
অরুণ কুমার বসাক, ইমেরিটাস অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশনা উৎসবে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহী সদর আসনের সাংসদ ও রাকসুর সাবেক ভিপি ফজলে হোসেন বাদশা। তিনি বলেন, ‘বইটির নাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা মানবতা। এই তিনটি জিনিস যদি সংকটে থাকে, তাহলে বাংলাদেশও সংকটে পড়বে। বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় এখন সংকটে আছে। সব উপাচার্যকে নিয়ে যদি বিতর্ক হয়, তাহলে আমরা কী করে টিকব?’

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি ছিলেন কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। ব্যক্তি অরুণ কুমার বসাককে নিয়ে তিনি বলেন, ‘তুলনার ভাষায় অরুণের প্রশংসা করা যায় না। এমন মানুষ অথচ এত আটপৌরে জীবন যাপন করে! আমি বিস্মিত হই। আবার অবাকও হই যে আমি অরুণ কুমার বসাক, সনৎ কুমার সাহা—এদের সঙ্গে রয়ে গেলাম। আমার সৌভাগ্য যে এমন কিছু মানুষের সঙ্গ পেলাম।’

অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সনৎ কুমার সাহা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। গণিত বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুব্রত মজুমদার উদ্বোধনী বক্তব্য দেন।

default-image

লেখকের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক বলেন, ‘আমি তো লেখক নই! নিজেকে লেখক বলতে আমার একরাশ লজ্জা হচ্ছে, আমি আবার লেখক! তবে বইটির বিষয়বস্তুতে যদি কোনো কৃতিত্ব থেকে থাকে, তার দাবিদার আমার ঘরে-বাহিরের শিক্ষক। সারা দুনিয়ার শিক্ষা আমাকে লালন করেছে।’ স্মৃতিচারণার সঙ্গে আক্ষেপ প্রকাশ করে এই অধ্যাপক বলেন, ‘আমার স্ত্রী মৃত্যুর আগে গ্রন্থটি প্রকাশের জন্য আমার ছাত্র মাসুম বিল্লাহর কাছে অর্থায়ন করে গিয়েছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য, গ্রন্থটির অবয়ব তিনি দেখে যেতে পারেননি।’

গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অধ্যাপক অরুণ কুমার বসাক বলেন, ‘পাঁচ দশক ধরে আমি সকাল-সন্ধ্যা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ল্যাবে সময় কাটাই। আমি লক্ষ করেছি, পদার্থবিজ্ঞানে ষাটের দশক থেকে শিক্ষার্থীদের মান তিলে তিলে হ্রাস পেয়ে আশির দশক থেকে ধস নামতে থাকে। শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে আসে, কিন্তু তাদের বহুবিধ সমস্যা। অঙ্ক মুখস্থ করে, বাংলা কথাও বোঝে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশিক্ষক নির্বাচনের সুবাদে এখন আমরা সাধ্য অর্জন না করতেই সাধ মেটাতে পারি। শুধু দুর্নীতিটা বেড়ে চলেছে। এর সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এখন আমরা সবাই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়তে চাই।’

প্রকাশনা উৎসবে অন্যদের মধ্যে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস, সাবেক সাংসদ আব্দুল ওয়াদুদ দারা, অনলাইনে জুমের মাধ্যমে পেনিনসুলা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনোয়ারুল হকসহ অধ্যাপক অরুণ বসাকের কয়েকজন গুণগ্রাহী শিক্ষক বক্তব্য দেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন