বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

পৌরসভার শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া ২২০ জনের মধ্যে ১১৩ জন ছাত্রী। ১০৭ জন ছাত্র। এঁদের ১১ জন বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে পড়ছেন। ৫৪ জন পড়ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর ঢাকা কলেজসহ দেশের বিভিন্ন কলেজে পড়ছেন ১৫৫ জন। কলেজে এইচএসসি থেকে অনার্সের শিক্ষার্থী আছেন।

পৌরসভার এই শিক্ষাবৃত্তি শুরু হয়েছিল ২০১৩ সালে। শহরের চাকলাপাড়া এলাকার একটি চা-দোকানে বসে ছিলেন পৌরসভার মেয়র সাইদুল করিম। চা খেতে খেতে সেখানে এক বাবা-মেয়ের কথোপকথন শুনতে পান তিনি। মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে। বাবা আপত্তি করছে। মেয়ে বলছে, ভর্তির সময় ১৩ হাজার টাকা লাগবে। এরপর তিন মাস ৫ হাজার টাকা করে দিলে চলবে। পরে তিনি নিজেই টিউশনি করে পড়ালেখার খরচ চালাবেন। বাবা সে টাকাও দিতে পারবেন না। মেয়ের চোখের কোনায় পানি। পৌর মেয়র তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মেয়েটির ভর্তির এবং পরবর্তী ৫ মাসের টাকা দেওয়ার আগ্রহের কথা জানান। পড়ালেখা শেষ করে মেয়েটি এখন ব্যাংকে চাকরি করছেন।

মেয়র সাইদুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, মেয়েটার পড়ার খরচ দেওয়ার পর তাঁর নিজের মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করে। পরের বছর তিনি পৌরসভার পক্ষ থেকে পৌর এলাকার মেধাবী ছেলেমেয়েদের সংবর্ধনা দেন। সেখানেও বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তাঁদের শঙ্কার কথা জানান। ওই বছরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন, পৌরসভার পক্ষ থেকে ছেলেমেয়েদের পড়ালেখায় সহযোগিতা করবেন। একপর্যায়ে পৌর পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ২০১৫ সালে গঠন করেন ‘শিক্ষাসহায়ক তহবিল’।

শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া ২২০ জনের মধ্যে ১১৩ জন ছাত্রী। ১০৭ জন ছাত্র। ১১ জন মেডিকেল কলেজে পড়ছেন। ৫৪ জন বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাকিরা পড়ছেন কলেজে।

আসিফ হাসান পড়ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাবা মুশফিকুর রহমান মোটরশ্রমিক। চারজনের সংসার তাঁদের। বাড়ি হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় হলেও থাকেন ঝিনাইদহ শহরের পুরাতন হাটখোলা এলাকায়। ২০১৮ সালে থেকে আসিফও পৌরসভার শিক্ষাবৃত্তি পাচ্ছেন। নগর উন্নয়ন, নাগরিক সেবা দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক তহবিল গঠন করে শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করায় অন্য পৌরসভা থেকে যেন কিছুটা আলাদা এখন ঝিনাইদহ পৌরসভা।

বর্তমান মেয়র সাইদুল করিম ২০১১ সালে প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন এবং এখনো সে দায়িত্ব পালন করছেন।

পৌরসভার সচিব মোস্তাক আহম্মেদ জানান, ২০১৫ সালের আগপর্যন্ত মেয়র নিজ উদ্যোগে কিছু ছেলেমেয়েকে বৃত্তি দিয়েছেন। এখন পৌরসভা থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়। পৌর পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অর্থ দিয়ে এই তহবিল শুরু হয়। এখন পৌরসভার বিভিন্ন আয়ের একটি অংশ এই তহবিলে জমা হয়। সচিব জানান, প্রথম বছর ৬ জনকে বৃত্তি দিয়ে দিলেও মাত্র ৭ বছরে বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন ২২০। এঁদের ১ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়।

বৃত্তিপ্রাপ্তদের কথা

শিক্ষাবৃত্তি পাওয়া আসিফ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, সেই সময় মেয়র পাশে এসে না দাঁড়ালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার প্রাথমিক সাহসটুকু হতো কি না, সন্দেহ। পৌরসভার এই উদ্যোগ অনেক ছেলেমেয়ের আগামী দিনগুলো বদলে দেবে। এরা সবাই ঝিনাইদহের মুখ উজ্জ্বল করবে একদিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শারমিনও পেয়েছেন শিক্ষাবৃত্তি। তিনি জানান, ২০১৭ সালে ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজে ভর্তি হন। মেসে থেকে পড়ালেখা করতেন। বাবা এক মাস টাকা পাঠাতে না পারলে চলা কষ্ট হয়ে যেত। একদিন ঝিনাইদহ পৌরসভার মেয়র তাঁদের এলাকায় যান। কোনো শিক্ষার্থীর পড়ালেখায় সমস্যা হলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সেই সূত্রে তাঁর বাবা পৌরসভায় যোগাযোগ করলে এই বৃত্তির ব্যবস্থা হয়। তিনি জানান, এইচএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত ১১০০ টাকা করে পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় এককালীন ১০ হাজার টাকা দিয়েছে পৌরসভা। আর মাসে দিচ্ছে দুই হাজার টাকা করে।

তহবিলের স্বপ্নদ্রষ্টা

ব্যক্তিগত উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দিয়ে পৌরসভাকে জেলার অনেক শিক্ষার্থীর জন্য সহায়ক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন পৌর মেয়র সাইদুল করিম। পৌরসভার কাউন্সিলর বশির উদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, পৌরসভার বার্ষিক বাজেটের সময় তাঁরা এই তহবিলে একটা বরাদ্দ দেন। এরপরও বিভিন্ন খাত থেকে এই তহবিলে টাকা জমা হয়। তিনি বলেন, ‘এটা মেয়রের একটা ভালো উদ্যোগ। ২০১৯ সালে আমার গ্রামের ছেলে শিমুল হোসেনকে এই তহবিল থেকে বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিই। ছেলেটি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। এ কাজগুলো মনে হলে ভালো লাগে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন