বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমি মারুফা খাতুন। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার এ জে এইচ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে মাধ্যমিক এবং তালা মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২১ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করি। উভয় পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছি। তবে পড়াশোনা চালিয়ে নিতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। সেসব দিনের গল্পই এখন বলব।

বাবা আজিত বিশ্বাস মৎস্যজীবী। মা তাসলিমা বেগম গৃহিণী। আমি ও আরও দুই বোন নিয়ে পাঁচজনের সংসার আমাদের। মাছ ধরে বাবার আয় হতো প্রতিদিন ২০০–২৫০ টাকা। এতে সংসার চলত না। এ জন্য আমার পড়াশোনা চালাতে মা কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করতেন। কিন্তু বাবার স্বল্প আয় ও মায়ের কাঁথা সেলাই করে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে পরিবারের তিন বেলা খাবার জুটত না। এসবের সঙ্গে ছিল আরেক বিড়ম্বনা। দুই শতক জমির ওপর দুই কক্ষের আধা পাকা একটি বাড়িতে আমাদের বসবাস। বৃষ্টি হলে ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে।

তালা উপজেলা সদর থেকে আমাদের গ্রাম জেয়ালা-নলতা ছয় কিলোমিটার দূরে। তালা উপজেলায় গিয়ে পড়াশোনা করতে আমার যে যাতায়াত খরচ লাগত, তা পরিবারের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। কলেজে কখনো হেঁটে, আবার কখনো ভ্যানে চড়ে যেতে হতো। এতে খরচের পাশাপাশি অনেক সময় নষ্ট হতো। তালা মহিলা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকেরা এসব শুনে আমাকে হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে দেন। আমার পড়াশোনার ব্যয়ও তাঁরা বহন করেন।

স্কুল ও কলেজ জীবন খুবই কষ্টে কাটিয়েছি। বাবা–মা অনেক কষ্টে পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন। কিন্তু দমে যাইনি। আমার সাফল্যের মূলে আছেন মা। তিনি সব সময় আমাকে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে আমি প্রাথমিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছি।

জেয়ালা–নলতা গ্রামের যে জেলেপাড়ায় আমাদের বসবাস, এখানকার অধিকাংশ মানুষ গরিব। এখনো সব পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি। আমি মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পাওয়ায় পাড়ার সবাই খুশি। খবরটি শোনার পর অনেক মানুষ এসেছেন আমাদের ঘরে। আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে আসা মানুষজন দেখে পাড়ার ছেলেমেয়েরাও স্বপ্ন দেখতে শিখছে। তারাও মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করে বড় কিছু হতে চাইছে।

স্কুল ও কলেজের যেসব শিক্ষক আমার পড়াশোনা এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছেন, মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর তাঁদের অনেকেই আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। এখনো নিচ্ছেন। মা–বাবার পাশাপাশি আমার শিক্ষকদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।

আমার মেডিকেলে ভর্তি ও পড়াশোনার খরচ চালানোর দায়িত্ব নিয়েছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক। আমি খুব খুশি যে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারব। অর্থনৈতিকভাবে যে বাধা ছিল, তা দূর হতে চলেছে। আমি সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী—যেন সবার ভালোবাসায় মেডিকেলের পড়াশোনা শেষ করে একজন মানবিক চিকিৎসক হতে পারি। একজন সত্যিকারের মানুষ হয়ে নিজেকে আমি দেশের সেবায় নিয়োজিত রাখতে চাই।

লেখক: মারুফা খাতুন, সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজের নবীন শিক্ষার্থী

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন