মানব পাচারের শিকার প্রতারিত তরুণদের কর্মসংস্থানের দাবি

‘মানব পাচারের শিকার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুরক্ষা: বেসরকারি খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা।
ছবি: সৌরভ দাশ

মানব পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই তরুণ প্রজন্মের। নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে দেশে সহায়সম্পদ বিক্রি করে স্বাবলম্বী হওয়ার আশায় বিদেশে যান তাঁরা। কিন্তু দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেকেই প্রতারিত হয়ে অসহায় অবস্থায় দেশে ফিরে আসেন। এখানে মানবেতর জীবন যাপন করেন। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য তরুণদের প্রকৃত পথ দেখাতে হবে। ফিরে আসা ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। এ ব্যাপারে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা দরকার।

রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম নগরের একটি পাঁচ তারকা হোটেলের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘মানব পাচারের শিকার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সুরক্ষা: বেসরকারি খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক মতবিনিময়ে বক্তারা এ কথা বলেন। সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের সহযোগিতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা উইনরক ইন্টারন্যাশনালের ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের প্রচার সহযোগী ছিল প্রথম আলো। এতে অংশ নেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও মানব পাচার নিয়ে কাজ করা সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা। সভা সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরী।

বক্তব্য দিচ্ছেন জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমাস শিমুল।
ছবি: সৌরভ দাশ

মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যাঁরা বিদেশে যান, তাঁদের অধিকাংশ দক্ষ বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। বিদেশিরা বারবার এ অনুযোগ করেন। অনেক কষ্ট করে এবং সম্পদ বিক্রি করে লোকজন প্রবাসে যান। কিন্তু সেখানে অমানুষিক কষ্টের পরও মানবেতর জীবন যাপন করেন। তাই দক্ষতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আবার যাঁরা প্রতারিত হয়ে ফিরে আসছেন, তাঁদের ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করতে হবে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও উচিত তাঁদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলমাস শিমুল বলেন, দুই শ্রেণির মানুষ দেশের বাইরে যাচ্ছেন। একটি হচ্ছে অতি মেধাবী এবং আরেকটি হচ্ছে কম মেধাবী। অতি মেধাবীরা মনে করছেন, দেশে তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ ও গবেষণার পরিবেশ নেই।

জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডে প্রতিবছর ৫০ জন অদক্ষ শ্রমিক নিয়োগ করা হয় জানিয়ে মো. আলমাস শিমুল বলেন, তাঁরা হাতে-কলমে কাজ করার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হয়ে ওঠেন। তাঁদের অনেকেই জিপিএইচে যেমন কাজ করছেন, তেমনি অন্য কারখানায়, এমনকি বিদেশেও চাকরি নিয়ে যেতে পারছেন। দক্ষ শ্রমিক তৈরির জন্য বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

‘আশ্বাস’-এর একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ৩০ বছরে ১০ লাখের বেশি নারী ও শিশুকে দেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ৪০০ নারী ও শিশু পাচারের শিকার হয়। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে ৩ লাখ বাংলাদেশি শিশু এবং ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করা হয়েছে। ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের আওতায় সাড়ে চার হাজার ভাগ্য বিড়ম্বিত মানুষের সঙ্গে কাজ করা হচ্ছে। যাঁদের ৭০ ভাগই নারী। দেশের পাঁচটি জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরায় কাজ চলছে।

আশ্বাস উইনরক ইন্টারন্যাশনালের টিম লিডার দীপ্তা রক্ষিত।
ছবি: সৌরভ দাশ

মানব পাচারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নারীনেত্রী ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইলমার প্রধান নির্বাহী জেসমিন সুলতানা বলেন, বয়স্ক লোকজন কাজের জন্য প্রবাসে যান না। মূলত তরুণেরাই যান। নানা কারণে হতাশাগ্রস্ত হয়ে তাঁরা বিদেশে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। ছেলেরা কোনো রকম সমাজে টিকে গেলেও প্রবাস থেকে ফিরে আসা মেয়েরা খুব দুরবস্থায় পড়েন। ভুক্তভোগী নারী ও তাঁদের পরিবার সমাজে নানাভাবে নাজেহালের শিকার হয়। এই নারীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এমনভাবে গড়ে তোলা দরকার, যাতে দেশেই নির্বিঘ্ন কাজ করতে পারেন। সরকারের পাশাপাশি এই দায় বেসরকারি খাতের ওপরও বর্তায়।

দেশেও দক্ষ ও পর্যাপ্ত শ্রমিকের সংকট রয়েছে উল্লেখ করে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, প্রবাসে শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করা যাবে না। বিদেশে যাওয়ার আগে তাঁদের কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করা উচিত। এতে বিদেশে গিয়ে ভালো চাকরি পাবেন। দেশে ভালো অঙ্কের টাকা পাঠাতে পারবেন। প্রতারিত হয়ে ফিরে আসা শ্রমিকদের কাজের ব্যবস্থা করা দরকার বলে মত দেন তিনি।

কনফিডেন্স সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, মানব পাচার সমস্যার পরিধি ব্যাপক। একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি প্রকল্প দিয়ে এ সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) পরিচালক মুনাল মাহবুব প্রতারিত হয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের পোশাকশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে যুক্ত করার তাগিদ দেন। তিনি বলেন, বিদেশ থেকে প্রতারিত হয়ে ফিরে আসা মানুষেরা দেশেও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে।

স্বাগত বক্তব্যে উইনরক ইন্টারন্যাশনালের ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের টিম লিডার দীপ্তা রক্ষিত বলেন, উইনরক ইন্টারন্যাশনাল চার দশক ধরে অর্থনৈতিক ও জীবিকার উন্নয়নে বাংলাদেশে কাজ করছে। সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এর বড় সুফলভোগী। মানব পাচারের শিকারের মানুষদের মনোবল ভেঙে যায়। ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের আওতায় তাঁদের কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হচ্ছে। প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।

সভায় আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম ইপিজেডের পরিচালক মো. নাদিমুল হক, প্যাসিফিক জিনসের মহাব্যবস্থাপক মেজর (অব.) সাদিন তৈয়ব, বাংলা-জার্মান সম্প্রীতির কর্মসূচি ব্যবস্থাপক জগদীশ চন্দ্র রায় প্রমুখ। সভায় ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক মো. আশরাফুল ইসলাম।