default-image

মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার তেওতা গ্রামের খোরশেদ আলম (৫০) পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে চলাচলকারী একটি লঞ্চে সুকানির কাজ করেন। নয় হাজার টাকা বেতনের পাশাপাশি তিনি সামান্য কিছু ভাতা পান। এ বেতনেই স্ত্রী, বৃদ্ধা মা–বাবা ও তিন সন্তানের সংসারের খরচ মেটাতে হয়। তবে করেনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ায় প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় তাঁর উপার্জনও বন্ধ। আয়–রোজগার বন্ধ হওয়ায় সাত সদস্যের পরিবার নিয়ে তিনি পড়েছেন চরম বিপাকে।

এ নৌপথে লঞ্চগুলো আরিচা নদীবন্দর এলাকায় নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রাখা হয়েছে। সম্প্রতি নোঙর করা লঞ্চের ভেতর কথা হয় সুকানি খোরশেদ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সবকিছুই চলছে। দোকানপাট খুলেছে। ছোট ছোট যানবাহনও চলছে। শুধু বাস ও লঞ্চ চলাচল বন্ধ আছে। আমাগো আয়–রোজগার বন্ধ তিন সপ্তাহের বেশি। লঞ্চেই বেকার বসে আছি। মালিক শুধু আমার খাওনের টাকা দিচ্ছে। কিন্তু পরিবারের খাওনের ব্যবস্থা হইবো কীভাবে? আমাগো কষ্টের কথা কে শুনবে?’

চলাচল বন্ধ থাকায় খোরশেদের মতো লঞ্চশ্রমিকদের চরম দুর্দশার মধ্যে দিন চলছে। সামনে ঈদ। অথচ কাজ নেই। উপার্জনও বন্ধ। সব মিলিয়ে এ ঈদ মৌসুমে বিপাকে পড়েছেন লঞ্চশ্রমিকেরা।

জেলা লঞ্চ মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া নৌপথে ২৬টি এবং মানিকগঞ্জের আরিচা ও পাবনার কাজীর হাট নৌপথে ১০টি লঞ্চ চলাচল করত। এসব লঞ্চের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের জীবিকা।

বিজ্ঞাপন

২৭ এপ্রিল সরেজমিনে আরিচায় দেখা যায় যাত্রীশূন্য লঞ্চঘাট। ঘাটের অদূরে দক্ষিণ পাশে যমুনা নদীর তীরে ৩০টির মতো লঞ্চ সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে রাখা হয়েছে। এসব লঞ্চের ভেতরে সুকানি, সারেং ও বাবুর্চিরা কর্মহীন সময় পার করছেন। কেউ কেউ লঞ্চ ধোয়ামোছার কাজ করছেন।

লঞ্চশ্রমিকদের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা বলেন, ৫ এপ্রিল প্রথমে লকডাউন ঘোষণা করায় গণপরিবহনের সঙ্গে নৌরুটের সব লঞ্চ ও স্পিডবোট সরকারি নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়। এদিকে লঞ্চ বন্ধ থাকলেও যাত্রীদের পারাপার বন্ধ হয়নি। লঞ্চ বন্ধের সুযোগে কিছু ট্রলারমালিক পদ্মায় যাত্রী পারাপার শুরু করেন। তাঁরা যাত্রীপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছেন। এ ছাড়া কিছু কিছু স্পিডবোটও যাত্রী পারাপার চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের আয়–রোজগার বেড়েছে লকডাউনে। অথচ লঞ্চ বন্ধ থাকায় লঞ্চশ্রমিকদের উপার্জন বন্ধ।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া গ্রামের ডাবলু সরদার মেসার্স মমতাজ নেভিগেশন কোম্পানি (এমভি ২৪২৯) লঞ্চের বাবুর্চির কাজ করতেন। আট বছর ধরে লঞ্চের ক্যানটিনে বাবুর্চির কাজ করে ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ চালিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, ‘গত বছর লকডাউনে লঞ্চ বন্ধের সময় সঞ্চয় যা আছিল, তা দিয়ে স্ত্রী-সন্তানদের খাবারের ব্যবস্থা করেছি। এবার লকডাউনের শুরুর সপ্তাহখানেক উপার্জনের ট্যাকায় সংসারের খরচ চালালেও পরে ধারদেনায় চলতে হয়। তবে সামনে ঈদ হওয়ায় এহন আর কেউ ট্যাহা-পয়সা ধার দিতে চায় না।’

মেসার্স এম এল মিজান লঞ্চের কর্মচারী মোহাম্মদ আলী মোল্লা বলেন, ‘লঞ্চ বন্ধ থাকলেও প্রতিদিন একবার ঘাটে আসি। মাঝেমধ্যে ধোয়ামোছা করি। টুকটাক মেরামতের কাজও কেউ কেউ করতাছে। শুনতাছি, সামনের সপ্তাহে লঞ্চ চালু হবে। চালু হইলেই বাঁচি।’

বেকার হয়ে পড়া লঞ্চশ্রমিকেরা আসলেই কষ্টে আছেন। এই শ্রমিকদের সহায়তায় মালিক সমিতি কোনো কিছু না দিলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি ঈদের আগে খাদ্যসহায়তা দেব।
আবদুর রহিম খান, জেলা লঞ্চ মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি

মেসার্স এমভি আরাফাত লঞ্চের কেরানি (টিকিট চেকার) আমির হোসেন বলেন, ‘আমাদের তো আর টাকাপয়সা বেশি জমানো থাকে না। এত দিন জমানো টাকাই খরচ করছি। সংসারের খরচ তো আর কম না। সামনে ঈদ, খরচ আরও বেশি। আসলে আমরা দারুণ কষ্টে আছি।’

জেলা লঞ্চ মালিক সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুর রহিম খান বলেন, ‘বেকার হয়ে পড়া লঞ্চশ্রমিকেরা আসলেই কষ্টে আছেন। এই শ্রমিকদের সহায়তায় মালিক সমিতি কোনো কিছু না দিলেও ব্যক্তিগতভাবে আমি ঈদের আগে খাদ্যসহায়তা দেব।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আরিচা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (নৌযান) শাহ আলম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, গণপরিবহন চালু হলেই লঞ্চ চালু হবে। তবে এ ব্যাপারে সরকারি কোনো নির্দেশনা পাননি। আপাতত বন্ধ থাকছে লঞ্চ। ঈদ সামনে রেখে বর্তমানে লঞ্চগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকারি নির্দেশনা এলেই চলাচল শুরু হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বেকার লঞ্চশ্রমিকদের সহায়তায় সরকারি সহায়তা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন