default-image

জয়নব বিবি ও তানজিলা আক্তারের বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকায়। বাড়ির পোষা ছাগল, মুরগি আর কিছু টাকা নিয়ে এসেছেন কিশোরগঞ্জ সদরের পাগলা মসজিদে। আসার কারণ জানতে চাইলে তাঁদের উত্তর, দীর্ঘদিন ধরে নানাজনের কাছে শুনে আসছেন, এখানে খাস নিয়তে দান করলে মনোবাসনা পূরণ হয়। তাই নানা জিনিস নিয়ে দানের জন্য এসেছেন।

জয়নব, তানজিলাদের মতো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন মানুষ ছুটে আসেন ঐতিহাসিক এই মসজিদে। তাঁদের দানে নরসুন্দা নদীর তীরের মসজিদটি এখন দেশের অন্যতম আয়কারী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃত। তিন-চার মাস পরপর মসজিদের দান সিন্দুক খোলা হয়। এই সময়ের মধ্যেই সিন্দুকগুলোতে জমা হয় কোটি টাকা। সর্বশেষ গত ২৩ জানুয়ারি দান সিন্দুক খুলে রেকর্ড পরিমাণ ২ কোটি ৩৮ লাখ ৫৫ হাজার ৫৪৫ টাকা পাওয়া গেছে। বিপুল পরিমাণ দানের এই নগদ টাকা ছাড়াও বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ও দান হিসেবে বেশ কিছু স্বর্ণালংকার পাওয়া গেছে। মসজিদের এই আয়ের অর্থ বিভিন্ন সেবামূলক খাত ও জটিল রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় করা হয়।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিমাংশে মসজিদটির সুউচ্চ মিনার বহুদূর থেকে চোখে পড়ে। বিশেষ করে রাতের বেলায় বাহারি রঙের আলোয় সজ্জিত মসজিদটির সৌন্দর্য আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

পাগলা মসজিদ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস সম্পর্কে স্বীকৃত কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। তবে জনশ্রুতি আছে। সেই জনশ্রুতির সূত্র ধরেই কিশোরগঞ্জের ইতিহাস বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, নরসুন্দা নদী একদা খুবই খরস্রোতা ছিল। হঠাৎ একদিন দেখা গেল, নদীর প্রবল স্রোতের মধ্যেই মাদুরে আসন করে ভেসে আছেন এক আধ্যাত্মিক সাধক। কয়েক দিনেই স্থানটিতে একটি চড়া জেগে ওঠে। অল্প দিনের মধ্যেই চারদিকে সাধকের গুণ-জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ে। তাঁকে ঘিরে আশপাশে অনেক ভক্তকুল সমবেত হন। পরে শিষ্যরা এখানে সাধকের জন্য একটি হুজরাখানা তৈরি করেন। তাঁর মৃত্যর পর হুজরাখানার পাশেই মরদেহ সমাহিত করা হয়। হুজরাখানার স্থানটিতেই পরবর্তীকালে একটি মসজিদ নির্মিত হয়। এ মসজিদটিই পরবর্তীকালে পাগলা সাধকের স্মৃতি হিসেবে ‘পাগলা মসজিদ’ নামে খ্যাতি লাভ করে।

তিনতলা মূল ভবনের উত্তর-দক্ষিণে ১০০ ফুট ও পূর্ব–পশ্চিমে বারান্দা ছাড়া ৯২ ফুট দৈর্ঘ্য। মসজিদটিতে রয়েছে ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি উঁচু মিনার। তিনটি বড় গম্বুজ। মসজিদসংলগ্ন নদীর পাড়ে বিশ্রামের জন্য ঘাটশেড।

মসজিদটি নিয়ে আরও একটি জনশ্রুতিতে রয়েছে। সে অনুযায়ী, হযরতনগরের প্রতিষ্ঠাতা হযরত খানের অধস্তন তৃতীয় পুরুষ জোলকরণ খানের বিবি সাহেবা পাগলা মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দেওয়ানবাড়ির এ নারী আধ্যাত্মিক সাধনায় যথেষ্ট উচ্চমার্গে উন্নীত হয়েছিলেন। বেগম সাহেবা নিঃসন্তান ছিলেন। জনসাধারণ তাঁকে ‘পাগলা বিবি’ বলে ডাকতেন। স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে তিনি নরসুন্দা নদী তীরে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর নামানুসারে মসজিদটি ‘পাগলা মসজিদ’ নামে পরিচিতি পায়। তবে এসব কেবলই জনশ্রুতি।

বিজ্ঞাপন

জানা যায়, মসজিদটি একসময় টিনের চালা ও বেড়াযুক্ত ছিল। বর্তমানে মসজিদটি তিনতলা ভবনের। মূল ভবনের উত্তর-দক্ষিণে ১০০ ফুট ও পূর্ব–পশ্চিমে বারান্দা ছাড়া ৯২ ফুট দৈর্ঘ্য। মসজিদটিতে রয়েছে ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি উঁচু মিনার। তিনটি বড় গম্বুজ। মসজিদসংলগ্ন নদীর পাড়ে বিশ্রামের জন্য ঘাটশেড। সামনে খোলা মাঠ, সীমানাপ্রাচীর ও নরসুন্দা নদীর ওপর মনোরম সেতু। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য মসজিদের চারপাশে বিভিন্ন রকম গাছসহ রয়েছে ১০৪টি বিভিন্ন রঙের বাতি।

default-image

এ ছাড়া মসজিদ–লাগোয়া রয়েছে নূরুল কোরআন হাফিজিয়া মাদ্রাসা। এখানে ১৩০ জন এতিম শিশু পড়াশোনা করে। যাদের খাওয়াদাওয়া ও থাকার সম্পূর্ণ ব্যয়ভার মসজিদের আয় থেকে বহন করা হয়। মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৩৪ জন স্টাফ রয়েছেন। এ ছাড়া ১০ জন সশস্ত্র আনসার পালাক্রমে সারাক্ষণ মসজিদের পাহারায় থাকেন।

জনশ্রুতির কারণে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসেন, দেশের বাইরে থেকেও মুসলমানসহ নানা ধর্মের মানুষ তাঁদের ইচ্ছা ও মনোবাসনা পূরণের জন্য এখানে দানখয়রাত করে থাকেন। মসজিদ কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. শওকত উদ্দিন ভূইয়া বলেন, গত বুধবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নেত্রকোনা, কেন্দুয়া, ভালুকাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ৭টি ছাগল, ৩৬টি মুরগি, ৫টি কবুতর, ৩ লিটার দুধ, ২টি নারকেল, ২টি লাউ, ১টি ডিম ও ১ বস্তা সিমেন্টের পাশাপাশি অনেকেই দান সিন্দুকে টাকাপয়সাসহ অন্যান্য জিনিস দান করেছেন। তিনি জানান, আসরের নামাজের পর মসজিদ প্রাঙ্গণে এগুলো বিক্রির জন্য ডাকা হয়। তবে শুক্রবার দানের পরিমাণ বেশি থাকে।

তিন-চার মাস পরপর দান সিন্দুক খোলার দিন ঘটে এলাহিকাণ্ড। প্রথমে মসজিদের আটটি দান সিন্দুক থেকে কয়েকটি বস্তায় টাকা ভরা হয়। এরপর মেঝেতে রেখে শুরু হয় দিনব্যাপী টাকা গণনা। এতে মসজিদ ও মাদ্রাসার ৬০ জন ছাত্র–শিক্ষক ছাড়াও ব্যাংক কর্মকর্তারা অংশ নেন। টাকা গণনার কাজে সার্বক্ষণিক তদারকি করেন কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটসহ কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও পাগলা মসজিদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

default-image

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম বলেন, এ মসজিদের দানের টাকা দিয়ে বড় আকারের একটি পাগলা মসজিদ ইসলামি কমপ্লেক্স নির্মাণসহ কিশোরগঞ্জবাসীর জন্য স্থায়ী সৃজনশীল কিছু তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন