মাকসুদুর রহমানের ভাষ্য, টাইগারের জন্ম তাঁর খামারেই। টাইগারের মা ছিল খামারে পোষা শাহিওয়ালের ক্রস ব্রিডিং জাতের গাভি। জন্ম ২০১৭ সালের ১০ অক্টোবর। পৌনে ৪ বছর বয়সী গরুটির ওজন ১ হাজার ৩২০ কেজি। মাকসুদুরের স্ত্রী রেহেনা খাতুন (৩৮) সকাল ও সন্ধ্যায় গরুটির পরিচর্যা করেন। প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ান। খামারে এখন গরু আছে টাইগারসহ ১৫টি। গরু রাখার শেড নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ টাকা। সব মিলে এখন পর্যন্ত খামারে বিনিয়োগ ৩৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ টাকা ব্যাংক ঋণ আছে তাঁর।

মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘জন্ম থেকেই চলনে-বলনে বাঘের মতো আচরণ টাইগারের। গায়ে সাদা-কালো ডোরাকাটা দাগ, রাগী স্বভাব, কাউকে দেখলেই ফুঁসে আসত। এসব দেখে আমার ১১ বছরের ছেলে রুবাইয়াত ওর নাম দেয় টাইগার। সেই থেকে ওর নাম টাইগার।’

মাকসুদুরের ভাষ্য, টাইগারকে প্রাকৃতিক খাবার খাওয়ানো হয়। বিচিকলা, গুড়, তেঁতুল ও সরিষার খৈলের পাশাপাশি এক বস্তা ভুসি (৩৭ কেজি), ৫০ কেজি করে গমের আটা, ৩০ কেজি ভুট্টার আটা, ৫ কেজি বুটের ডাল, ৩ কেজি অ্যাংকর ডাল, আধা কেজি জাউ, ১ কেজি কালোজিরা ভালো করে মিশিয়ে বিশেষ ধরনের খাবার তৈরি করা হয়। এর সঙ্গে খড় ও ঘাস খাওয়ানো হয়।

রেহেনা খাতুন বলেন, পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে টাইগার মন খারাপ করে থাকে, চোখ দিয়ে পানি ঝরে।

রেহেনা বলেন, ‘তিনটা সন্তানের মতোই টাইগার আমার আরেক সন্তান। নিজের হাতে লালন করেছি, খাইয়েছি। ওর অসুখ-বিসুখ হলে ছটফট করেছি। টাইগারকে বিক্রি করা হবে, এমনটা ভেবে খুব কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সংসারে দায়দেনা আছে। এ কারণে উপায়ও নেই। বিক্রির পর টাইগারকে বিদায় দিতে হবে, এ কথা ভাবতেও খুব কষ্ট হচ্ছে।’

করোনার ধাক্কায় দেশে ফেরা, গরুর খামারে সফল উদ্যোক্তা

জীবিকা অন্বেষণে দেড় দশক আগে বিদেশ গিয়েছিলেন মাকসুদুর রহমান। দীর্ঘ সময় প্রবাসে কাটিয়েছেন। দুবাই, কাতারে দিনরাত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেছেন, কষ্টে উপার্জন করা পারিশ্রমিকের টাকা দেশে পাঠিয়েছেন। বিদেশ থেকে পাঠানো সেই টাকায় স্ত্রী রেহেনা খাতুন বাড়িতে গরু পালন করেন। সব মিলে ভালোই দিন কাটছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস সবকিছু লন্ডভন্ড করে দেয়।

মাকসুদুর রহমানের ভাষ্য, তাঁর পৈতৃক বাড়ি ধুনট উপজেলায়, যমুনা নদীর দুর্গম বৈশাখীর চরে। পৈতৃক বসতভিটা যমুনায় বিলীন হওয়ার পর শেরপুরে খোন্দকার টোলায় এসে থিতু হন তিনি। বৈদ্যুতিক ওয়ারিংয়ের কাজ করে কোনো রকমে জীবিকা চালাতেন। সংসারে স্ত্রী ছাড়াও দুই মেয়ে, এক ছেলে। অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে ভাগ্য ফেরাতে ২০০৫ সালে প্রথমে দুবাই যান। সেখানে একটি কারখানায় বৈদ্যুতিক শ্রমিকের কাজ করতেন। ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ায় ২০১০ সালে দেশে ফিরে আসেন। ২০১২ সালে শখের বসে দুটি গাভি কিনে পালন শুরু করেন তাঁর স্ত্রী রেহেনা। সেই গাভি দুটি বাচ্চা দেয়। শখের এই খামারে একসময় গরুর সংখ্যা ৫-এ দাঁড়ায়। ২০১৪ সালে ভাগ্য ফেরাতে কাতার যান তিনি। মাসিক ২৫০০ রিয়াল বেতনে কাজ শুরু করেন।

২০১৬ সালে সেখানকার আরেকটি প্রতিষ্ঠানে ৩৩০০ রিয়াল বেতনে চাকরির প্রস্তাব পান। কিন্তু আগের প্রতিষ্ঠান তাঁকে ছাড়তে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে দুই বছরের মাথায় দেশে ফিরে আসতে হয় তাঁকে। টাকাপয়সা জোগাড় করে ২০১৮ সালে আবার কাতার যান। ভালো বেতনের চাকরি জুটেছিল তাঁর। কিন্তু করোনায় সব লন্ডভন্ড হয়। কাজ হারিয়ে গত বছরের জুনে দেশে ফেরেন।

মাকসুদুর রহমান বলেন, ‘দেশে ফেরার পর লকডাউনে সব প্রায় অচল ছিল। আয়-উপার্জন বন্ধ থাকে। স্ত্রী-সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারতাম না। দেখলাম, খামারে টাইগারের সঙ্গে আমার ১১ বছরের ছেলেটার অন্য রকম সখ্য। সারা দিনে টাইগারের সঙ্গে খেলে, পিঠে চড়ে, খাবারও দেয়। ছেলের পশুপ্রেম দেখে হঠাৎ করেই গরুর খামার করার ইচ্ছা মাথায় আসে। কিন্তু শহরে খামার করার জায়গা পাব কোথায়? শেষে বোনের বাড়িতে খামার করার সিদ্ধান্ত নিই। উপজেলার ছোট ফুলবাড়ি গ্রামে বোনের বাড়িতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ করে গরু রাখার জন্য খামারের দুটি আধা পাকা শেড নির্মাণ করি। এরপর গত বছরের কোরবানির ঈদে মোটাতাজাকরণের জন্য ৫ লাখ টাকায় ১৮টি দেশি গরু তুলি খামারে। টাইগারসহ আগে থেকে বাড়িতে পালন করা ৫টি গরুও খামারে যোগ হয়। সব মিলিয়ে খামারে গরুর সংখ্যা ২৩। ইতিমধ্যে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে সাতটি গরু বিক্রি করেছি। এখন টাইগার ছাড়াও খামারে আছে ১৫টি গরু।’