বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি ২ হাজার ২৫০ একর বনাঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে এই সাফারি পার্ক। এর আগে (১৯৮০ সালে) এটি ছিল হরিণ প্রজননকেন্দ্র। বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, বংশবিস্তার, বন্য প্রাণী নিয়ে গবেষণা এবং দর্শনার্থী ও পর্যটকদের চিত্তবিনোদনের জন্য পার্কটির প্রতিষ্ঠা।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাজাহারুল ইসলাম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এখন দৈনিক গড়ে দেড় হাজার দর্শনার্থী প্রাণিকুলের লাফঝাঁপ দেখতে আসছেন। কারোনার আগে এর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ হাজার। সকাল নয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পার্ক খোলা। বন্ধ থাকে সপ্তাহে এক দিন, মঙ্গলবার।

সাফারি পার্কের নিয়ম হলো, প্রাণীরা উন্মুক্ত থাকবে, আর দর্শনার্থীরা আবদ্ধ থাকবে। নিরাপত্তাবেষ্টিত গাড়িতে চড়ে মানুষ দেখবে উন্মুক্ত প্রাণী। তবে এখানে তার ব্যতিক্রম। প্রাণীরা আবদ্ধ আর দর্শনার্থীরা উন্মুক্ত। ২০০১ সালের ১৯ জানুয়ারি ২ হাজার ২৫০ একর বনাঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে এই সাফারি পার্ক। এর আগে (১৯৮০ সালে) এটি ছিল হরিণ প্রজননকেন্দ্র। বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, বংশবিস্তার, বন্য প্রাণী নিয়ে গবেষণা এবং দর্শনার্থী ও পর্যটকদের চিত্তবিনোদনের জন্য পার্কটির প্রতিষ্ঠা।

জয়-জুঁইয়ের লাফঝাঁপ

বুধবার বেলা তিনটা। বেষ্টনীর ভেতরে ক্লান্ত শরীরে গা এলিয়ে বসা জয় ও জুঁই। বন্য প্রাণী রক্ষক নুরুজ্জামান মাংস নিয়ে বেষ্টনীর কাছে যেতেই একসঙ্গে লাফ দিয়ে ওঠে তারা। মাংসের ঝুলি দেখে লোহার বেষ্টনীর ফাঁক গলে থাবা বের করার চেষ্টা। মাংস ভেতরে যেতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে খাবার গিলতে। পাশের বেষ্টনীর আরেকটি কক্ষে আঁখি ও বড়ুয়া খেলা করছিল। মাংসের গন্ধ পেতেই লাফালাফি শুরু। দর্শনার্থী দেখে হুংকার ছাড়ে, করে দৌড়ঝাঁপ। থাবা বাড়িয়ে ওরা মানুষকে আপন করে নিতে চায়। কিন্তু মানুষ ধরা দেয় না। কারণ, ওদের বিশ্বাস নেই, সুযোগ পেলেই থাবা বসিয়ে দেবে জানিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ভ্রমণে আসা দর্শনার্থী কামরুল ইসলাম বললেন, বাঘগুলো বন্দিজীবনে থেকেও মানুষের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত।

সাফারি পার্ক সূত্র জানায়, ২০১২ সালে আনা হয় জয়, জ্যোতি ও জুঁই নামের তিনটি বাঘের বাচ্চা। ২০১৪ সালে জ্যোতিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় ঢাকা চিড়িয়াখানায়। ২০১৫ সালে জয় ও জুঁইয়ের সংসারে আসে দুটি বাচ্চা। একটি বাচ্চা মারা যায়, বেঁচে থাকা অন্য বাচ্চাটির নাম আঁখি। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে আনা হয় বড়ুয়া নামের আরেকটি আফ্রিকান নারী বাঘ। চারটি বাঘকে প্রজননের সুবিধার্থে দুটি কক্ষে রাখা হয়েছে।

সাফারি পার্ক সূত্র জানায়, পার্কের প্রাণিকুলের জন্য প্রতিদিন গরুর মাংস লাগে ৪৫ কেজি। এর মধ্যে চারটি বাঘের জন্য লাগে ২০ কেজি। আর পাঁচটি সিংহের জন্য লাগে ২৫ কেজি মাংস।

সাফারি পার্কে ঢুকতে হাতের বাঁয়ে সরু রাস্তায় চোখে পড়ে অজগর, বানর, পাখিশালা, সাম্বার ও চিত্রা হরিণ এবং কুমিরের বেষ্টনী। কুমিরের বেষ্টনীর ভেতরে জরাজীর্ণ কাঠের সেতু। ওই সেতুতে উঠে কুমির দেখেন মানুষ। সামনে কিছু দূর গেলে হাতির বিচরণক্ষেত্র। মানুষ হাতির পিঠে চড়ে ঘুরছেন, তুলছেন ছবি। পাশে দশতলার একটি ওয়াচ টাওয়ার। আছে চারতলা ও দোতলার আরও দুটি ওয়াচ টাওয়ার। তার পাশে জলহস্তীর বেষ্টনী। সেখানে ১০টি জলহস্তীর দৌড়ঝাঁপ। রাস্তার দুই পাশে বিভিন্ন প্রাণীর কিছু প্রতীকী অবয়ব, সব কটি অবয়বে নতুন রং লাগানো হয়েছে।

default-image

পার্কের ডান দিকে ভালুকের বেষ্টনী। এই বেষ্টনীতে ২২টি ভালুক। ভালুকের বেষ্টনীর বিপরীতে বাঘ ও সিংহের বেষ্টনী। সিংহের বেষ্টনীতে আছে পাঁচটি সিংহ। দর্শনার্থী দেখে ক্ষণেক্ষণে তারা হুংকার ছাড়ছে।

সিংহের বেষ্টনী পেরিয়ে এক কিলোমিটার দূরে জেব্রার বেষ্টনী। খুনসুটি ও খেলাধুলায় যাচ্ছে তাদের দিনকাল। জেব্রার পাশে গিয়ে ছবি তুলছেন দর্শনার্থীরা।

হেঁটে পুরো পার্ক ঘুরতে সময় লাগে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। পার্কে ঘোরার জন্য আছে একটি এসি ও দুটি নন–এসি বাস। বাসে পার্ক ঘুরতে সময় লাগে ৪৫ মিনিট । এসি বাসে জনপ্রতি ভাড়া ১০০ টাকা, নন–এসিতে ১৪ জন ৪০০ টাকা। পার্কে ৩০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা ১৮ কিলোমিটার।

পার্কে ঢুকতে টিকিট কাটতে হয়। প্রাপ্তবয়স্ক ৫০ টাকা, অপ্রাপ্তবয়স্ক (১৫ বছরের নিচে) ২০ টাকা। ১-১০০ জনের শিক্ষার্থী দলকে ৫০০ টাকা এবং ২৫০ জন পর্যন্ত শিক্ষার্থী দলকে ৮০০ টাকা গুনতে হয়।

সাফারি পার্কটি অনেকটা চিড়িয়াখানার আদলে গড়ে উঠেছে। এটা সাফারির প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ওমর ফারুক, চট্টগ্রামের লোহাগাড়া সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা

পার্কে ঘুরতে আসা চট্টগ্রামের লোহাগাড়া সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ওমর ফারুক বলেন, সাফারি পার্কটি অনেকটা চিড়িয়াখানার আদলে গড়ে উঠেছে। এটা সাফারির প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তা ছাড়া একজন দর্শনার্থীর হেঁটে পার্কটি ঘুরে দেখতে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় ব্যয় হয়। এককভাবে বাসে ঘুরতে গেলেও ব্যয়বহুল। এ জন্য তিন-চারজনের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গাড়ির দরকার।
দর্শনার্থীদের অভিযোগ, পার্কের ভেতরে বখাটের উৎপাত লক্ষণীয়। অনেক সময় ছিনতাই হয়। পার্কের কয়েকজন কর্মচারী বলেন, ওয়াচ টাওয়ারগুলো বখাটেদের দখলে থাকে।

নির্জন বনজঙ্গলে টাওয়ারগুলো স্থাপিত হওয়ায় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে জানিয়ে পাশের ডুলাহাজারা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, লোকবলসংকটের কারণেই পার্কটি বখাটেমুক্ত রাখা যাচ্ছে না।

কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পার্কে আছে জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, জলহস্তী, ময়ূর, অজগর, কুমির, হাতি, বাঘ, ভালুক, সিংহ, হরিণ, লামচিতা, শকুন, কচ্ছপ, রাজধনেশ, কাকধনেশ, ইগল, সাদা বক, রঙ্গিলা বক, সারস, কাস্তেচরা, মথুরা, নিশিবক, কানিবক, বনগরুসহ ৫২ প্রজাতির ৩৪১টি প্রাণী। এরা বেষ্টনীর ভেতর আবদ্ধ। উন্মুক্তভাবে রয়েছে গুইসাপ, শজারু, বাগডাশ, মার্বেল ক্যাট, গোল্ডেন ক্যাট, ফিশিং ক্যাট, খ্যাঁকশিয়াল, বনরুইসহ ১২৩ প্রজাতির ১ হাজার ৬৫টি প্রাণী।

বন্য প্রাণী চিকিৎসালয়ে চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন, সহকারী ভেটেরিনারি সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বললেন, ভেটেরিনারি সার্জনের পদটি শূন্য দীর্ঘদিন। চিকিৎসালয়ে নেই প্যাথলজি সেন্টার । জটিল রোগে আক্রান্ত প্রাণীকে পাঠাতে হয় চট্টগ্রামের ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন