মায়ের কিডনিতে বেঁচে প্রিয় ক্যাম্পাসে ফিরে আপ্লুত জাহিদুল

চিকিৎসা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পর জাহিদুল ইসলামকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেন তাঁর বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা
ছবি: প্রথম আলো

জাহিদুল ইসলামের দুটি কিডনিই বিকল হয়ে গিয়েছিল। ছেলেকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি কিডনি দিয়ে দেন মা। এরপর চিকিৎসা ব্যয় চালাতে শেষ সম্বল বসতভিটাও বিক্রি করতে হয় তাঁদের। সেই জাহিদুল সুস্থ হয়ে ফিরেছেন তাঁর প্রিয় ক্যাম্পাস বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে আর ফিরতে পারবেন বলে কল্পনাও ছিল না তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার পর আজ রোববার দুপুরে তাঁকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান শিক্ষক-সহপাঠীরা।

আরও পড়ুন

আবেগজড়িত কণ্ঠে জাহিদুল বলেন, ‘আমার চিকিৎসার জন্য এই ক্যাম্পাস ছেড়ে যখন চলে যাচ্ছিলাম, তখন ভাবছিলাম, এই যাওয়া হয়তো আমার শেষ যাওয়া। আমি আর দেখতে পারব না প্রিয় ক্যাম্পাস। তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। আপনা–আপনি কান্না এসেছিল। আর আজ গাড়ি থেকে নেমে ক্যাম্পাসের দিকে তাকাতেই চোখে পানি এসেছে। আগে একবার দুঃখে কেঁদেছি। এখন সত্যিই যখন ফিরে এলাম, এবার সুখ আর আনন্দে চোখে পানি এল।’

গত ৬ ফেব্রুয়ারি ‘ছেলের জন্য মায়ের কিডনি দান, বসতভিটা বিক্রি করেও চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে দুশ্চিন্তা’ শিরোনামে প্রথম আলোয় সংবাদ প্রকাশিত হয়। এরপর দেশ-বিদেশের মানুষ জাহিদুলের চিকিৎসার সাহার্যার্থে এগিয়ে আসেন। জাহিদুল বলেন, ‘আমি বিশেষভাবে চিরকৃতজ্ঞ প্রথম আলোর প্রতি। কেননা একাধিক প্রতিবেদন করা হয়েছে প্রথম আলোয়। এরপর দেশ-বিদেশ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। চিকিৎসায় খরচ হয়েছে ১৫ লাখ টাকার ওপরে। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা এসেছে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছ থেকে। আর বাকি টাকা আমার বড় বোনের নিজের ২০ শতাংশ জমি এবং আমাদের বসতভিটা বিক্রি থেকে।’

প্রিয় ক্যাম্পাস আর বিভাগে ফিরে আসার পর নানা অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জাহিদুল বলেন, ‘ভাবছিলাম, এই ক্যাম্পাসে হয়তো আর ফিরে আসতে পারব না। যখন এলাম, তখন আনন্দে চোখে পানি এসেছে। এরপর আমার বাংলা বিভাগে যাই। সেখানে প্রিয় স্যাররা আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন। আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছেন। এ যেন আমি নতুন জীবন ফিরে পেলাম। আমি যখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তখন আমার স্নাতক (সম্মান) পরীক্ষার ফলাফল হয়েছে। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর জানতে পারি, আমার ফলাফল ২ দশমিক ৯৭।’

পরিবার-পরিজনদের প্রতিদান দেওয়ার জন্য বেঁচে থাকতে চান জাহিদুল। তিনি বলেন, ‘নিজেকে বাঁচাতে হবে, ঘুরে দাঁড়াতে হবে। বেঁচে থাকতে হবে আমার মা, বোন, ভাইদের জন্য। সেই সঙ্গে যাঁরা আমার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি চিরকৃতজ্ঞ। বর্তমানে ওষুধ কিনতে প্রতি মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে। এসব ব্যয় আমার বোন করছেন। সেই সঙ্গে হৃদয়বান মানুষের সাহায্যের কিছু টাকাও জমা রয়েছে। সে টাকাও বর্তমানে ওষুধের পেছনে খরচ হচ্ছে।’

জাহিদুল বর্তমানে রংপুর নগরের পার্ক মোড়ে একটি মেসে বন্ধুর আশ্রয়ে রয়েছেন। দুই বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য বড় ভাই জাকির হোসেন। তিনি হানিফ পরিবহনের সুপারভাইজার। তাঁদের বাড়ি পঞ্চগড়ের থেকরপাড়া এলাকায়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জাহিদ। স্নাতক (সম্মান) চূড়ান্ত পরীক্ষা শেষ করে গত বছরের অক্টোবরে পঞ্চগড়ে নিজ বাড়িতে ফেরার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ধরা পড়ে, তাঁর দুটি কিডনিই বিকল। সেখানে কয়েক দিন চিকিৎসার পর গত বছরের ৩ নভেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসেন। সেখানে শ্যামলী সেন্টার ফর কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করানো হয়। এরপর গত ২২ জানুয়ারি রাতে মা ও ছেলের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান ও কলা অনুষদের ডিন তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘জাহিদ সুস্থ শরীরে ফিরেছে, এটা আমাদের পরম আনন্দের। ওর মা নিজের কিডনি দিয়ে সন্তানের জীবন বাঁচিয়েছেন। ওর মায়ের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা।’