ভুক্তভোগী তরুণদের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৪ মাস আগে উপজেলার ২৮ তরুণকে অবৈধ পথে ইতালিতে নেওয়ার প্রলোভন দেখান ফরহাদ মাতুব্বর। এ জন্য প্রত্যেকের সঙ্গে ৯ লাখ টাকার চুক্তি হয়। সেই অনুযায়ী প্রথমে সাড়ে চার লাখ টাকা দিতে হয়। লিবিয়া হয়ে ইতালিতে পৌঁছানোর পর নেওয়া হবে বাকি সাড়ে চার লাখ। চুক্তি অনুসারে টাকা নিয়ে ২৮ তরুণকে দুবাই হয়ে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে চুক্তির বাকি সাড়ে চার লাখ টাকা আদায় করা হয়। টাকা দেওয়ার পর তাঁদের লিবিয়ার দালালদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে দালালদের কাছে বন্দী ওই ২৮ তরুণের কাছে আরও ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে। তরুণদের অনেকে দালালদের টাকা দিয়েও মুক্তি পাচ্ছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লিবিয়ায় বন্দী ২৮ জনের মধ্যে ৭ জনই ওই ইউপি চেয়ারম্যানের নিজ এলাকার বাসিন্দা। তাঁরা হলেন সালাম ব্যাপারীর ছেলে মেহেদী ব্যাপারী (২০), মোক্তার ব্যাপারীর ছেলে সাগর ব্যাপারী (১৯), করিম সরদারের ছেলে বনি সরদার (২২), আলী ঘরামির ছেলে ফয়সাল ঘরামি (১৯), আমির ঘরামির ছেলে এনামুল ঘরামি (১৮), আদালি ঘরামির ছেলে সোহেল ঘরামি (২৩) ও সৈকত ঘরামি (২০)। এ ছাড়া উপজেলার জনারদন্দি এলাকার আদেলউদ্দিন সরদারের ছেলে আহাদ সরদার, কবির সরদারের ছেলে হাসান সরদারসহ আরও ১৯ জন তরুণ দালালদের কাছে বন্দী আছেন।

সাগরের মুখে শেষ কথা শোনার পর থেকে আমাগো মাথায় আকাশ ভাইঙ্গা পড়ছে। কিছুই ভালো লাগছে না। চেয়ারম্যানের কাছে আমরা কয়েকজন মিইলা গেছি। চেয়ারম্যান আমাগো লগে দেখা করেন না। কথাও বলেন না। ফোন দিলে ছেলেকে আর পাব না বলে ভয় দেখায়।
লিবিয়ায় দালালদের হাতে বন্দী সাগরের বাবা মোক্তার হোসেন

গোপালপুর এলাকার ভ্যানচালক মোক্তার ব্যাপারীর একমাত্র ছেলে সাগর ব্যাপারী তাঁর মা রেহানা বেগমের সঙ্গে সর্বশেষ ২০ দিন আগে কথা বলেন। মায়ের সঙ্গে ছেলের শেষ কথা ছিল, ‘মা, তোমরা আমারে উদ্ধার কর, ওরা আমারে মাইরা ফালাইবে। যা টাকা চায়, ওদের দিয়া দাও।’ সাগরের বাবা মোক্তার হোসেন বলেন, ‘সাগরের মুখে শেষ কথা শোনার পর থেকে আমাগো মাথায় আকাশ ভাইঙ্গা পড়ছে। কিছুই ভালো লাগছে না। চেয়ারম্যানের কাছে আমরা কয়েকজন মিইলা গেছি। চেয়ারম্যান আমাগো লগে দেখা করেন না। কথাও বলেন না। ফোন দিলে ছেলেকে আর পাব না বলে ভয় দেখায়।’

ইউপি চেয়ারম্যান ফরহাদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ করেন আলী ঘরামি। তিনি বলেন, তাঁর ছেলে ফয়সালের সঙ্গে এক মাস ধরে কোনো যোগাযোগ নেই। ছেলের কোনো খবর পাচ্ছেন না তাঁরা। চেয়ারম্যান শুধু বলেন, তাঁরা সবাই ভালো আছে। কিন্তু ছেলের সঙ্গে তাঁদের কথা বলিয়ে দিচ্ছেন না।

মানব পাচার নিয়ে কথা হয় কালকিনি পৌরসভার মেয়র এস এম হানিফের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান ফরহাদের মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি শুনেছি। তাঁর মাধ্যমে ২৮ তরুণ লিবিয়ায় গেছেন। এর মধ্যে কয়েকজন আমার পৌরসভার বাসিন্দা। বিষয়টি পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বসহকারে দেখা উচিত।’

অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ফরহাদ মাতুব্বর মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাসেল, সরোয়ার, ফারুক নামের বেশ কয়েকজন দালাল ওই ছেলেদের লিবিয়ায় নিয়ে গেছেন। আমি তাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই। এলাকার লোকজন আমাকে জানানোর কারণে টাকা দেওয়ার সময় আমি শুধু সেখানে উপস্থিত ছিলাম। এখন যাঁরা আমার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ করছেন, তাঁদের সঙ্গে আমি কোনো কিছুতে জড়িত নই। তাঁরা মিথ্যা বলছেন।’ ভিডিওর বিষয়ে জানতে চাইলে ভিডিও তাঁর নয় বলে দাবি করেন তিনি।

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দিপংকর তঞ্চ্যাঙ্গা বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে তিনি কোনো অভিযোগ পাননি। তাঁরা সহযোগিতা চাইলে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

কালকিনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইশতিয়াক আশফাক প্রথম আলোকে বলেন, ভুক্তভোগী ২৮ জনের অনেকেই পুলিশের সঙ্গে মানব পাচারের বিষয়টি আলাপ করেছেন। তাঁরা মামলা করতে চান, আবার চান না। মামলা করতে তাঁরা কিছুটা ভয়ও পান। তাঁরা মনে করেন, মামলা হলে তাঁদের ছেলেকে লিবিয়ার দালালেরা মেরে ফেলবেন। দালালেরাও ভয় দেখান। এটিও সত্য। তবে বিষয়টি পুলিশের নজরদারিতে আছে। ভুক্তভোগীরা আইনি সহায়তা চাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।