নাছিমার স্বামী মো. আবুল হোসেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক। ঘটনার দিন তিনি যাত্রী নিয়ে ত্রিশালে গিয়েছিলেন। সেখানে থেকে ওই কারখানায় বিস্ফোরণের খবর পান। বাড়ি এসে জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। সেদিন নাছিমাকে কাজে না যাওয়ার জন্য বলেছিলেন আবুল হোসেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একদিন সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সবাই সবকিছু ভুলে যাবে। কিন্তু আমার চারটি মাতৃহারা মেয়ে তাদের মাকে কোথায় পাবে।’

বাড়ির নারী স্বজনেরা বলেন, আতশবাজির কারখানায় কাজ করে যে অর্থ পেতেন, তা দিয়ে সংসারে খরচ জোগানোর পাশাপাশি চার মেয়েকে সাজিয়ে–গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসতেন নাছিমা। মেয়েদের জন্য নতুন পোশাক-আশাক, পায়ের নূপুর, প্রসাধনী ইত্যাদি এনে দিতেন। এখন নাছিমা নেই। কী হবে তাঁর অবুঝ মেয়েদের?

নিহত অপর শ্রমিক আপিলা খাতুনের বাঁশহাটি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, কবর খুঁড়ে পাশে রাখা হয়েছে বাঁশের টুকরাগুলো। বাড়িতে প্রবেশ করলে এগিয়ে আসেন আপিলার ছেলে মো. রুবেল আহমেদ। তিনি ঢাকায় সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তার গাড়ির চালক। গতকাল (বুধবার) তাঁকে মুঠোফোনে কল করে জানানো হয়, তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মাকে দেখার জন্য বাড়িতে এসে দেখেন সব শেষ। বিস্ফোরণের পর নিহত নাছিমাকে তাঁর স্বজনেরা কিছুটা চিনতে পারলেও আপিলাকে চেনা যাচ্ছিল না। স্বজনদের কাছে জেনেছেন, তাঁর মায়ের সারা শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।

রুবেল আহমেদ জানান, তাঁর মা একসময় তাঁর সঙ্গে ঢাকায় থাকতেন। বাবা আবদুল গণির অসুস্থতার কারণে আট মাস আগে গ্রামে চলে আসেন। তাঁর দুই বোন। একজনের বিয়ে হয়ে গেছে। আরেক বোন নান্দাইল সরকারি শহীদ স্মৃতি আদর্শ ডিগ্রি কলেজে প্রথম বর্ষে পড়ছেন। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে আতশবাজি কারখানায় কাজ নেন আপিলা খাতুন। সপ্তাহে দুই থেকে তিন হাজার টাকা আয় করতেন। রুবেল আহমেদ বলেন, শুনেছেন, ওই কারখানায় প্রায় ৫০ জন নারী কাজ করতেন। ওই দিন সকালে বৃষ্টি না থাকলে কারখানায় আরও বেশি শ্রমিক উপস্থিত হতেন।

এক প্রশ্নের উত্তরে রুবেল বলেন, ‘একটি কারখানা গড়ে উঠলে এর বৈধতা নিয়ে তো শ্রমিকদের কিছু জানার কথা নয়। সেটি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার লোকদের দেখার কথা। ঢাকার কোনো কারখানায় দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। আমাদের এখানে তেমন কিছু করা হবে বলে মনে হয় না।’

এ বিষয়ে কথা হয় নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আবুল মনসুরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ প্রশাসনের কাছে আবেদন করেনি। তা ছাড়া ঘটনাটি একটি অবৈধ আতশবাজির কারখানায় বিস্ফোরণসংক্রান্ত। এ ঘটনায় মামলাও হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের নবনির্বাচিত সদস্য মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, নিভৃত একটি গ্রামে আতশবাজির এত বড় একটি কারখানা কীভাবে চলছিল, তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন। যেকোনো কারখানা স্থাপন করলে অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ দ্বারা কারখানায় পরিদর্শন করা হয়। কিন্তু এখানে এসব হয়েছে বলে মনে হয় না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন