default-image

সবে সন্ধ্যা নেমেছিল। স্বামী ও দুই সন্তান নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেছিলেন মিনু রাণী দাশ। খাওয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। তখনই দরজায় ধাক্কা। কয়েক সেকেন্ড পরে লাথি। পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে স্থানীয় রাজাকাররা ঘরে ঢুকেই স্বামীকে দুই হাত পেছনে বেঁধে মারতে মারতে বাইরে নিয়ে যায়। মিনু রাণী তাদের পায়ে ধরে স্বামীকে ছেড়ে দেওয়ার আকুতি করেন। তার বিনিময়ে জোটে লাথি। ছিটকে পড়েন দেয়ালে। সেখানেই জ্ঞান হারান।
শুধু তাঁর স্বামী বিরাজ কান্তি দাশ নয় একই দিন পাড়ার আরও ১৭ জনকে ধরে নিয়ে যায় হানাদাররা। সময়টা একাত্তরের সেপ্টেম্বর। পাড়ার মানুষগুলোর বিরুদ্ধে ‘অভিযোগ’ ছিল তাঁরা মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। ধরে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ জনকে মেরে পুঁতে ফেলা হয় এক কিলোমিটার দূরের পাহাড়ি জঙ্গলে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বিরাজ কান্তি দাশও। এ ঘটনা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার পোমরার মধুরাম তালুকদারপাড়ার।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মুক্তিযোদ্ধারা একটি সফল অভিযান চালিয়ে বিদ্যুতের টাওয়ার ধ্বংস করে দেন। অভিযানের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেন পাড়াটিতে। তখন থেকে হানাদারদের নজর পড়ে পাড়াটির ওপর। এরপরই আসে নির্মম আঘাত।
৩ মার্চ সেই মধুরাম তালুকদারপাড়ায় গেলে কথা হয় মিনু রাণী দাশের সঙ্গে। পরনে ধবধবে সাদা শাড়ি। গায়ে চাদর। চেহারায় বয়সের বলিরেখা। একাত্তরের কথা তুলতেই একরাশ ক্ষোভ ঝাড়েন। বলে ওঠেন, ‘কী হবে এসব জেনে? কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। কীভাবে বেঁচে আছি কেউ দেখতে পর্যন্ত আসেনি।’
মিনু রাণী যখন স্বামীর ঘরে আসেন তখন তিনি কিশোরী। বয়স হবে ১৩ কী ১৪। স্বামী কৃষি কাজ করতেন। সংসারও ভালোই চলছিল। দুই ছেলের জন্মের পর আবার মা হতে চলেছিলেন। কিন্তু একাত্তর সব তছনছ করে দিল।
মিনু রাণী বলেন, ‘মানুষটি রাতের ভাত পর্যন্ত খেতে পারেননি। ধরে নিয়ে যাওয়ার দুই তিন দিন পর জানতে পারলাম পোমরা বনবিটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলেছে। মারার আগে তাঁদের দিয়ে গর্ত খোঁড়ানো হয়। সেই গর্তে মেরে পুঁতে দেয় ১৩ জনকে। লাশের সৎকার পর্যন্ত করতে পারিনি। ভয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে কেউ যেতে পারেনি। স্বাধীনের পর গর্তটি খুঁজে বের করি। তত দিনে লাশ পচে গলে গেছে।’
এতক্ষণ প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে পড়া মিনু রাণী যেন ভেঙে চুরমার হয়ে পড়লেন। দরদর করে চোখ বেয়ে নামছে পানি। আঁচলে চোখ মুছে কান্না সংবরণ করার চেষ্টা করছিলেন।
কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে একাত্তরের পরের দিনগুলোতে ফিরে গেলেন। বললেন, ‘মানুষটি মরে গেল। আর আমার শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। দেশ স্বাধীনের পরপর জন্ম নিল ছোট মেয়েটা। তিন ছেলেমেয়ের মুখে খাবার তুলে দিতে মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেছি। নিজে খেতখামার করেছি। শেষে মিলল পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে আয়ার চাকরি। সেই চাকরির টাকায় সন্তানদের বড় করেছি। অনেক কষ্ট করে চলেছি। সাহায্য তো দূরে কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেনি।’ মিনু রাণী এখন চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। সন্তানদের সঙ্গে থাকেন স্বামীর ভিটা মধুরাম তালুকদারপাড়ায়।
মিনু রাণীর মতো ক্ষোভ পাড়ার অন্য শহীদ পরিবারের লোকজনেরও। সবার এক কথা, এত বড় ত্যাগের পরও তাঁদের নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।
মধুরাম তালুকদারপাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দেয়ালে লেখা সেদিনের শহীদদের নাম। বছরান্তে নিজেদের টাকায় দেয়ালের মুছে যাওয়া নামে নতুন করে রং লাগান সযত্নে। এই নাম নিয়েই বেঁচে থাকা স্বজনহারা মানুষগুলোর।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন