বিজ্ঞাপন

আহম্মেদ মুসার স্বজন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১৫ মে দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। আহম্মেদ মুসা ব্যক্তিগত কাজ শেষ করে দুপুরে ঢাকার সদরঘাট থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরছিলেন। এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চটি অন্তত ২৫০ যাত্রী নিয়ে বেলা দুইটার দিকে নড়িয়ার সুরেশ্বর ঘাটের দিকে যাত্রা শুরু করে। বেলা সাড়ে দিনটার দিকে মুন্সিগঞ্জের ইমামপুর ইউনিয়নের দৌলতপুর এলাকায় মেঘনা নদীতে পৌঁছালে ঝড়ের কবলে পড়ে। প্রচণ্ড ঝড়ে লঞ্চটি ডুবে যায়। লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগমুহূর্তে মুসা এমন বিপদের কথা পরিবারের সদস্যদের মুঠোফোনে জানান। পরে মুসার আর কোনো সন্ধান পায়নি স্বজনেরা।

লঞ্চটি নিয়মিত সদরঘাট থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর ঘাটে যাতায়াত করত। ভেদরগঞ্জ ও নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের মানুষ লঞ্চটিতে যাতায়াত করতেন। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ৫৭ জনের লাশ উদ্ধার করেন। আর দুর্ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ৫০ থেকে ৬০ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি। দুর্ঘটনার পর পাঁচ দিন উদ্ধার তৎপরতা চালানো হয়েছিল।

আহম্মেদ মুসার বাবা নুর মোহাম্মদ শেখ বলেন, ‘মুসা আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সাত বছর হলো। ও সব সময় পরিবার ও বন্ধুবান্ধবকে মাতিয়ে রাখত। মানুষের জন্য কাজ করে বেড়াত। আমার অন্য ছেলেমেয়েরা ইউরোপ-আমেরিকায় থাকে। ওর সেখানে যাওয়ার কথা ছিল। ওর মা এখনো ছেলের জন্য কেঁদে যাচ্ছে। পথ চেয়ে ছেলের অপেক্ষায় আছে। এখন শুধু দোয়া করি, আল্লাহ ওকে যেখানে রেখেছেন, সেখানে যেন শান্তিতে রাখেন।’

আহম্মেদ মুসার বন্ধু পার্থ সারথি রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘মুসা নেই। ওর রেখে যাওয়া সামাজিক ও মানবিক কাজের স্মৃতিগুলো আমাদের কষ্ট দেয়। মানুষের কল্যাণের জন্য ওর দেখানো পথে আমরা এখনো চলি। আমরা জানতেও পারিনি ওর শেষ পরিণতিটা কী হয়েছিল। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর অনেক মানুষের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু মুসার কোনো চিহ্ন আমরা খুঁজে পাইনি। এখনো তাঁর জন্য অপেক্ষায় আছি।’

মিরাজ-৪ লঞ্চে ওই দিন যাত্রী ছিল নড়িয়ার করনহোগলা গ্রামের মেহেরাজ খন্দকার। সে ঢাকার রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের ছাত্র ছিল। গ্রীষ্মের ছুটিতে সে গ্রামে ফিরছিল। মেহেরাজের বাবা পিয়ারু খন্দকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘লঞ্চ ডুবে যাওয়ার আগমুহূর্তে নদীতে ডুবে যাওয়ার কথা বলছিল আর আর্তনাদ করছিল। বাবা হয়েও কিছু করতে পারিনি। তিন দিন পর তার নিথর দেহ নিয়ে বাড়িতে ফিরেছি। সাত বছর ধরে এ ভয়াল স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছি।’

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আবদুর রাজ্জাক কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রভাষক আসাদুজ্জামান মিন্টু ওই লঞ্চ দুর্ঘটনায় মারা যান। তাঁর ভাই সদরের পালং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান আতাউর রহমান গগন খান বলেন, ‘বাড়ির একটি মসজিদ সংস্কারের কাজ চলছিল। ঢাকায় বড় ভাইয়ের কাছ থেকে মসজিদ সংস্কারের টাকা নিয়ে ফিরছিল আসাদুজ্জামান। লঞ্চটি যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন ফোনে জানিয়েছিল সে কোন কেবিনে ছিল আর কেবিনের ড্রয়ারে টাকা রাখার কথা। সে মারা গেলে যেন ওই কেবিন তল্লাশি করি। লঞ্চটি যখন নদী থেকে ওঠানো হয়, তখন কেবিনে ওর নিথর দেহটি পাই। ড্রয়ারে টাকাটাও পাই। সেই ভয়াল স্মৃতি আমাদের পরিবারকে এখনো তাড়া করে ফেরে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন