default-image

ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন তাঁর চিকিৎসক হওয়ার। তাই শত বাধাবিপত্তি আর পরিবারের অভাবেও লেখাপড়ায় হাল ছাড়েননি সুলতানা। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে পেয়েছেন বৃত্তি। এসএসসি ও এইচএসসিতে এ–প্লাস পান। এবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার মেধা তালিকায় ৩৮৮তম হয়ে ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস পড়ার সুযোগ পেয়েছেন সুলতানা। এমন খুশির মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর পরিবারের অভাব।

মেয়েটির পুরো নাম সুলতানা আক্তার সাদিয়া। তাঁর বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের হয়বতনগর এলাকায়। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের এসভি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে এসএসসি ও ২০২০ সালে গুরুদয়াল সরকারি কলেজে থেকে এইচএসসিতে এ–প্লাস পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।

সুলতানার মা নাজমা আক্তার বলেন, তাঁর চার মেয়ে এক ছেলে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর সন্তানেরা মেধাবী। কিন্তু অভাবের তাড়নায় বড় দুই মেয়ের পড়াশোনা বেশি দূর করানো যায়নি। তাই এইচএসসির পরই দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তবে ছোটবেলা থেকেই সুলতানার প্রবল ইচ্ছা লেখাপড়া চালিয়ে যাবেন, বড় হয়ে ডাক্তার হবেন। সুলতানা ছাড়াও তাঁর আরেক মেয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের এসভি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ে। সবার ছোট ছেলে জেলা শহরের সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।

বিজ্ঞাপন
লকডাউনের কারণে হোটেল বন্ধ থাকায় নেমে আসে চরম দুর্দশা। মেয়েটি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। এমন মহা খুশির দিনেও হাত শূন্য থাকায় বাড়িতে মেয়েটিকে দেখতে পর্যন্ত তিনি যেতে পারেননি। মেয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেও অর্থের অভাবে দুশ্চিন্তা তাঁর পিছু ছাড়ছে না।
মো. আবদুল্লাহ, সুলতানার বাবা

নাজমা আক্তারের স্বামী মো.আবদুল্লাহ ঢাকার একটি খাবার হোটেলে বাবুর্চির কাজ করেন। সেই টাকায় সংসারই ঠিকমতো চলে না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানো ভীষণ কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। সন্তানদের পড়ালেখা চালাতে গিয়ে তাঁকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) আশা ও গ্রামীণ ব্র্যাক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এক বছর ধরে করোনার কারণে স্বামীর হোটেলের চাকরির অবস্থাও ভালো যাচ্ছে না। নিয়মিত ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করতে পারছেন না। এরই মধ্যে মেয়ের স্বপ্নের মেডিকেলে ভর্তির সুযোগে শত খুশির মধ্যে নাজমার মধ্যে হতাশা ও দুশ্চিন্তা ভর করেছে। কীভাবে মেয়েকে মেডিকেলে ভর্তি করাবেন, পড়ালেখার খরচ চলাবেন এই ভেবে।

সুলতানার বাবা মো. আবদুল্লাহ বলেন, দুই বছর আগে ঢাকার মাওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়ামের কাছে নামহীন একটি খাবারের হোটেলে বাবুর্চির চাকরি নেন তিনি। গেল বছর করোনার শুরু থেকে এটার অবস্থাও শোচনীয়। এদিকে দু-তিন সপ্তাহ ধরে করোনার মহামারি আর লকডাউনের কারণে হোটেল বন্ধ থাকায় নেমে আসে চরম দুর্দশা। মেয়েটি মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো। এমন মহা খুশির দিনেও হাত শূন্য থাকায় বাড়িতে মেয়েটিকে দেখতে পর্যন্ত তিনি যেতে পারেননি। মেয়ে তাঁর স্বপ্ন পূরণে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেও অর্থের অভাবে দুশ্চিন্তা তাঁর পিছু ছাড়ছে না।

অভাবের টানাটানির সংসার তাঁদের। মায়ের ঋণের কিস্তির বোঝা। বাবার হোটেলের চাকরির দৈন্যদশা। মেডিকেলে ভর্তি ও লেখাপড়ার খরচ। ঢাকায় কোথায়, কীভাবে থাকবেন এসব নিয়ে পরিবারের সবাই চিন্তার মধ্যে আছেন।
সুলতানা আক্তার সাদিয়া, মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পাওয়া দরিদ্র শিক্ষার্থী

পড়াশোনার জন্য মা-বাবার অবদান বলে শেষ করা যাবে না বলে জানান সুলতানা আক্তার সাদিয়া। তিনি বলেন, শত কষ্টের মধ্যেও মায়ের উৎসাহ আর স্কুল-কলেজের শিক্ষক ও স্বজনদের আন্তরিক সহযোগিতায় তিনি আজ এই পর্যন্ত আসতে পেরেছেন। ছোটবেলা থেকে চিকিৎসক হওয়ার যে স্বপ্ন তিনি লালন করেছেন, মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি। তবে খুশির এই সময়ে বাবাকে কাছে না পেয়ে তাঁর মন খারাপ। অভাবের টানাটানির সংসার তাঁদের। মায়ের ঋণের কিস্তির বোঝা। বাবার হোটেলের চাকরির দৈন্যদশা। মেডিকেলে ভর্তি ও লেখাপড়ার খরচ। ঢাকায় কোথায়, কীভাবে থাকবেন এসব নিয়ে পরিবারের সবাই চিন্তার মধ্যে আছেন। চিকিৎসক হয়ে হতদরিদ্র মানুষকে সেবা করার ইচ্ছা পূরণ নিয়ে শঙ্কার মধ্যে আছেন তিনি।

কিশোরগঞ্জ এস ভি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহনাজ কবীর বলেন, তাঁর বিদ্যালয়ে সুলতানার সঙ্গে পড়া অন্তত ২৩ জন শিক্ষার্থী এবার মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে। এতে সবাই খুব খুশি। তবে সুলতানার পরিবারটি হতদরিদ্র। সে সুযোগ পেলে আরও ভালো করবে। সে গরিবের ডাক্তার হিসেবে সুনাম অর্জন করবে। সুলতানার স্বপ্ন পূরণে সবাইকে এগিয়ে আসা দরকার।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন