মোহনায় অসংখ্য জাল, গতিপথ পাল্টেছে ইলিশ

সাগর থেকে ধরে আনা জাটকা ইলিশ। গতকাল সকালে বরগুনার পাথরঘাটার বিএফডিসি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে
ছবি: প্রথম আলো

ইলিশের ভরা মৌসুমে গভীর সাগরে জাটকা ধরা পড়ার ইতিহাস নেই। কিন্তু এবার দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে জেলেরা জাল ফেলে যে ইলিশ পাচ্ছেন, তার সিংহভাগই জাটকা। আর নদ-নদীতে তো ইলিশ নেই-ই। নদ-নদীর মোহনায় জাল পেতে রাখায় ইলিশ গতিপথ পাল্টেছে বলে ধারণা করছেন জেলে ও মৎস্য বিশেষজ্ঞরা।

দেশের বৃহত্তম মৎস্যবন্দর পাথরঘাটা মৎস্য অবতরণকেন্দ্রে দেখা যায়, রোববার মাত্র ২০ মণ ইলিশ এসেছে, যার সবই জাটকা। এফবি মায়ের দোয়া নামে একটি ট্রলার থেকে অবতরণকেন্দ্রের শ্রমিকেরা ঝাঁপি ভরে এসব মাছ তুলছিলেন। ট্রলারটির মাঝি আফজাল হোসেন (৫৫) বলছিলেন, ‘৪০ বচ্ছর ধইরা সাগরে জাল বাই। কোনো দিন ইলিশ এই ভরা মৌসুমে জাটকা জালে ওডে নায়। এইবার খেও দিলে অল্পস্বল্প যে মাছ ওডে হেইয়্যা সবই জাটকা।’

বরগুনার পাথরঘাটার মৎস্য বন্দরের ব্যবসায়ী ও জেলেরা জানান, এবার যাও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে সেটা সাগরে। এসব ইলিশ আকারে জাটকার মতো। ১৪০টিতে এক মণ ওজন হয় এমন আকারের। আবার এসব মাছের ১০-১২ শতাংশের পেটে ডিম আছে। এই ভরা মৌসুমে এখানে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার মন ইলিশ আসার কথা। সেখানে ৪০ থেকে ১০০ মণ পাওয়া যাচ্ছে, তা–ও জাটকা।

নদ-নদীতে ইলিশ না পাওয়ার পেছনে জেলেরা কয়েকটি কারণের কথা উল্লেখ করেছেন। জেলেরা বলছেন, দক্ষিণের নদীগুলো বরগুনার পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বর এবং ভোলার তেঁতুলিয়া, বুড়াগৌরাঙ্গ হয়ে মেঘনা অববাহিকা থেকে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। মোহনার এসব অংশে বেহুন্দি, ভাসা, খুঁটা জাল দিয়ে সারা বছর ঘিরে রাখায় এখানে নির্বিচারে ইলিশের পোনাসহ সব ধরনের মাছের পোনা আটকা পড়ে। জাল দিয়ে ঘিরে রাখায় এই মোহনার পুরো অংশে কয়েক শ কিলোমিটারজুড়ে ডুবোচর পড়ে গেছে। একই সঙ্গে সুন্দরবন ও সাগর মোহনায় বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ফলে জাটকাসহ বিপুল মাছ এই ফাঁদ থেকে বেঁচে ফিরলেও সাগরে গিয়ে বিষক্রিয়ায় মারা যাচ্ছে। এসব কারণে নদীতে ইলিশ ঢুকতে পারছে না এবং সাগরেও গতিপথ পাল্টে অন্যদিকে চলে গেছে।

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ করে ইলিশ নাই হয়ে যাওয়ার পেছনে আমাদের কাছে এই কারণগুলোই মুখ্য মনে হচ্ছে।’

নদীতে ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে চট্টগ্রাম মেরিন ফিশারিজের পরিচালক শরিফ উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাগর মোহনায় খুঁটা ও বেহেন্দি জাল দিয়ে ঘিরে রাখা, ডুবোচর, নাব্যতা হ্রাস একটি বড় কারণ। এ ছাড়া আমাদের মাছ ধরার নৌকার সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে। এতে ইলিশ গভীর সাগরে চলে যাচ্ছে। ফলে ইলিশের গতিপথ বাধাপ্রাপ্ত হয়ে তারা পথ পরিবর্তন করছে।’

বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মাছবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশের পর্যবেক্ষণে গত চার বছরে যে তথ্য পাওয়া যায়, তাতে সাগর ও নদ-নদীতে ধরা পড়া ইলিশের গড় ওজন ৩৫০ গ্রাম বেড়ে ৮৫০ থেকে ১ কেজির ওপরে হয়েছিল।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর জুলাইয়ে বিভাগে ইলিশ আহরিত হয়েছিল ১৮ হাজার ৬৫ মেট্রিক টন। কিন্তু চলতি বছরের জুলাইয়ে তা কমে হয় ১১ হাজার ২২২ টন। এক বছরের ব্যবধানে এক মাসেই ইলিশ উৎপাদন কমেছে ৬ হাজার ৮৪৩ টন।

ওয়ার্ল্ড ফিশের ইকোফিশ-২ প্রকল্পের দলনেতা অধ্যাপক আবদুল ওহাব প্রথম আলোকে বলছেন, ‘বিষয়টি আমাদের কাছেও বিস্ময়কর লাগছে। মাঝে কক্সবাজারে বেশ ইলিশ ধরা পড়েছে। কিন্তু দেশের ইলিশের মূল কেন্দ্র বরিশাল অঞ্চলে এবার ইলিশ এল না।’ তিনি বলেন, অক্টোবরে প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে। সে সময় যদি নদীতে ইলিশ আসে, তবে বুঝতে হবে আগে তাদের আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। আর যদি না আসে, তবে বুঝতে হবে আসলেই ইলিশের বৃদ্ধির ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাটকা সুরক্ষায় শৈথিল্য, উজানে উঠে আসার পথে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া, সাগরের জলবায়ুর প্রভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধির মতো কারণগুলো যুক্ত থাকতে পারে। এটা ব্যাপকভাবে গবেষণা করে সম্মিলিতভাবে ইলিশ ব্যবস্থাপনায় নতুন পরিকল্পনার উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদ দিলেন তিনি।