বান্দরবান সদর উপজেলার চিম্বুক পাহাড়ের ছাতংপাড়ার বাসিন্দা পাসিং ম্রো জানান, তাঁদের ১০ জনের পরিবার। সব মিলিয়ে পরিবারের আয় মাসে মোটামুটি ছয় হাজার টাকা। কদিন আগেও এই টাকায় সংসার চালিয়ে নিতেন তাঁরা। কিন্তু এখন কষ্ট বেড়েছে।

পাসিং ম্রো বলেন, তাঁদের চাল বেশি লাগে, মাসে মোটামুটি ১০০ কেজি। কেরোসিন তেল লাগে চার লিটার। মাস কয়েক আগেও তাঁরা প্রতি কেজি চাল ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা দরে কিনতে পারতেন। এখন ৪০ টাকার মতো লাগছে। আর কেরোসিন তেল কিনতে লিটারে খরচ বেড়েছে ১৫ টাকা।

উল্লেখ্য, গত নভেম্বরে সরকার ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়েছে।

বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ের ম্রোলংপাড়া থেকে আলীকদম-থানচি সড়কের ক্রাউডং (ডিমপাহাড়) পর্যন্ত ঘুরে দরিদ্র ম্রো জনগোষ্ঠীর প্রায় একই রকম অবস্থা দেখা গেছে। কেউ না খেয়ে নেই। তবে কষ্ট বেড়েছে।

সরকার ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ন্যায্যমূল্যে ছয়টি পণ্য—তেল, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, ছোলা ও খেজুর বিক্রি করছে। ম্রো পরিবারগুলো জানিয়েছে, টিসিবির সুলভ মূল্যের তেল-ডাল তাঁরা কেনে না। কারণ, তাঁদের সেটা প্রয়োজন হয় না।

আলীকদম উপজেলার দিরিপাড়ার কার্বারী (পাড়াপ্রধান) তংপ্রে ম্রো বলেছেন, তাঁরা ভাতের সঙ্গে তরকারি হিসেবে জঙ্গলের শাকসবজি (কলাগাছ, কলার মোচা, কচুশাক, ঢেঁকিশাক) নাপ্পি দিয়ে রান্না করে খেয়ে থাকেন। এমনিতে তাঁরা তেলের বদলে নাপ্পি খাওয়াতে বেশি অভ্যস্ত। তার ওপর তেলের দাম বেশি। দরিদ্র পরিবারে সেই বিলাসিতার সুযোগ নেই। পাড়ার ১১টি পরিবার জুমচাষ করে বছরের তিন মাসের খোরাকও পায় না।

বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উক্যনু মারমাও বলেন একই কথা। তিনি উল্লেখ করেন, পাহাড়িদের কাছে ভাতের পর নাপ্পি প্রয়োজন। দরিদ্র ম্রোরা সয়াবিন, চিনি ও ডালকে বাড়তি খরচ মনে করেন।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো বলছে, তাদের অনেকেরই ১০ টাকা কেজি দরে চাল কেনার জন্য কার্ড রয়েছে। বছরে পাঁচ মাস এই দরে চাল দেওয়া হয়। এক দফা দেওয়া হয় সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর সময়ে। আরেক দফা মার্চ ও এপ্রিল মাসে। তবে অনেক পরিবারই এককালীন টাকা না থাকার কারণে সেই চাল কিনতে পারে না। আবার কোনো ক্ষেত্রে দুর্গম পথে বারবার যেতে হয় বলে পরিবহন খরচ লাগে, তাই কেউ কেউ চাল তুলতে যায় না।

বান্দরবান সদর উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা আবুই রঞ্জন তঞ্চঙ্গ্যা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের কাছ থেকে কার্ডের বিপরীতে চাল নেওয়া হয়। এবার ১০ টাকা কেজির চাল বিতরণ শিগগিরই শুরু হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জুমের জমি ও ফলন কমে যাওয়া এবং বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় শিক্ষায় অনগ্রসর ম্রো জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে ফলের বাগান করলেও অধিকাংশের জায়গাজমি না থাকায় কর্মহীন হয়ে শুধু দিনমজুরিনির্ভর হয়ে পড়ছেন।

অবশ্য শুধু ম্রো পরিবার নয়, কষ্টে আছে সব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষই। বান্দরবান জেলা পরিষদের সদস্য সিয়ং খুমি বলেন, খুমিদের দারিদ্র্যের হার ম্রোদের চেয়ে বেশি। মোট ৩৭৫ পরিবারের মধ্যে মাত্র ১৪-১৫টি পরিবার মোটামুটি সচ্ছল।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন