মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি

দুই মাস আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ক্ষতির পর আবারও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানল।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চার দিনের ভারী বর্ষণে দক্ষিণ উপকূলের পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও বাগেরহাটে মৎস্য খাত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। দুই মাস আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে ক্ষতির পর আবারও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হানল। আকস্মিক এ ক্ষতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন এ অঞ্চলের মৎস্যচাষিরা।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য বিভাগ বলছে, অতিবর্ষণে মৎস্য খাতের এত ক্ষয়ক্ষতি নজিরবিহীন। পটুয়াখালী, বরগুনা ও পিরোজপুর এ তিন জেলায় প্রাথমিক হিসাবে ক্ষতি হয়েছে ২৩ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে এখনো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া বিরাজ করায় পূর্ণাঙ্গ তালিকা পেতে কয়েক দিন সময় লাগবে। বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে মৎস্যচাষিদের আর্থিক ক্ষতি ১১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

বঙ্গোপসাগর উপকূলের এলাকা নয়া ভাইজোড়া। এটি বরগুনার তালতলী উপজেলায় অবস্থিত। ওই এলাকার মাছচাষি আলম খান (৫০) প্রায় ৭ একর জমিতে ঘের করেছিলেন। খরচ হয়েছিল প্রায় ৭ লাখ টাকা। আশা করেছিলেন লাভের মুখ দেখবেন। কিন্তু চার দিন ধরে টানা অতি ভারী বর্ষণ আর অধিক উচ্চতার জোয়ারের তাণ্ডবে সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে গেছে। পাশে জাল দিয়ে ঘের রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পানির তোড় এতটাই অত বড় আয়তনের ঘেরের মাছ আর আটকে রাখতে পারেননি।

আলম খান গতকাল শুক্রবার বলছিলেন, ‘অ্যার চাইতে বইন্না ভালো। বইন্না অইলে তো ক্ষতির চিহ্ন থাহে। কিন্তু এহন যা অইছে হেইয়্যা তো দ্যাহা যায় না। মাছ-পোনা সব শ্যাষ।’ এই গ্রামের আরেক মাছ চাষি আবদুর রহিম ধারদেনা করে ৫ লাখ টাকা ব্যয় করে মাছ চাষ করেছিলেন। তাঁর সব মাছও ভেসে গেছে বৃষ্টি আর জোয়ারে। আক্ষেপ করে তিনি বলছিলেন, ‘এই বইন্নায় মোগো ঘর ভাঙে নায়। কিন্তু মোগো মেরুদণ্ড ভাঙছে।’

গত সোমবার থেকে বৃষ্টি শুরু। মঙ্গলবার শুরু হয় ভারী বর্ষণ। মঙ্গলবার থেকে বুধবার ২৪ ঘণ্টায় বরগুনা জেলায় ২৬২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। গতকাল শুক্রবারও থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে।

স্বাভাবিকভাবে বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের মৎস্যচাষিরা বিভিন্ন সময় ঘূর্ণিঝড়ের সংকেত পেলে ঘেরগুলো রক্ষায় নানা উদ্যোগ নেন। কিন্তু এবার ঝড় ছাড়াই এত এত ক্ষতির মুখে পড়বেন তা ভাবতে পারেননি। মৎস্য বিভাগ বলছে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে চার দিন ধরে অবিরাম অতি ভারী বর্ষণে দক্ষিণ উপকূলের জেলাগুলোর মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এ ক্ষতি স্বাভাবিক সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের প্রায় সমান।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এ বিভাগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পটুয়াখালীতে। এ জেলার ৬ হাজার ৬১৭টি পুকুর ও মাছের ঘের ডুবে গেছে। প্রাথমিকভাবে কমপক্ষে ১৮ কোটি ২১ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন অন্তত তিন হাজার মৎস্যচাষি। জেলায় ১ লাখ ১৫ হাজার ছোট-বড় পুকুর ও ১৫ হাজার মাছের ঘের রয়েছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোল্লা এমদাদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে জেলায় ৫৫০টি ঘের ও ৬ হাজার ৬৭টি পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে। প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ ১৮ কোটি ২১ লাখ টাকা। এতে অন্তত তিন হাজার মৎস্যচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।

বরগুনার ছয় উপজেলায় ভেসে গেছে ৫ হাজার ৮৮১টি পুকুর ও ১৫৩টি ঘেরের মাছ। এতে ২৩০ মেট্রিক টন মাছ ভেসে গেছে। এ ছাড়া ১৩ লাখ মাছের পোনা ও এক লাখ গলদা চিংড়ি পোনা ভেসে গেছে। আর অবকাঠামো ক্ষতি হয়েছে ৯৭ লাখ টাকা। এই জেলায় মৎস্য খাতে মোট প্রাথমিক ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রবল বর্ষণে জেলার মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ইতিমধ্যে আমরা পানিতে তলিয়ে যাওয়া পুকুর ও ঘেরের তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বিভাগীয় মৎস্য কার্যালয়ে পাঠিয়েছি।’

এ ছাড়া পিরোজপুরে ৮১০টি ঘেরের মধ্যে ৬৮টি ঘেরের মাছ ভেসে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ১১ লাখ টাকা।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৬৭ হাজার মাছের ঘের রয়েছে। টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে বিভিন্ন উপজেলার ১৭ হাজার ৩৭৫ মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে মৎস্যচাষিদের আর্থিক ক্ষতি ১১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছে জেলা মৎস্য বিভাগ।

বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য বিভাগ সূত্র জানায়, গত বছরের জুনে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বিভাগের ছয় জেলায় মৎস্য খাতে ১৯ হাজার ২৪টি মাছের খামার, ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল প্রায় ২৫ কোটি ৫৩ দশমিক ১৪ লাখ টাকা। আর চলতি বছরের মে মাসে ইয়াসের প্রভাবে জোয়ার-জলোচ্ছ্বাসে বিভাগের মৎস্য খাতে প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ৮৬১ হেক্টর আয়তনের ১৭ হাজার ২০৯টি ঘের ও পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ৮২ কোটি ৮ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছিল।

বিভাগীয় মৎস্য বিভাগের উপপরিচালক আনিসুর রহমান তালুকদার বলেন, ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা হাতে পাওয়ার পর ঢাকায় পাঠানো হবে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার জন্য সুপারিশ করা হবে।