শুধু জায়েদা বেওয়া নন, যমুনার ঢলে ভেসে গেছে সারিয়াকান্দির নোয়ারপাড়া চরের ২০০ বসতঘর। ঘরহারা চরের প্রায় ৮০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে পার্শ্ববর্তী সুজনের পাড়া, শিমুলতাইড় ও সরলিয়া চরের আশ্রয়কেন্দ্রে। ঘর হারিয়ে এসব মানুষ এখন দিশেহারা।

এ ছাড়া সারিয়াকান্দি উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সারিয়াকান্দির মথুরাপাড়া পয়েন্টে আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বিপৎসীমার ৪২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। পানিবন্দী ১০ হাজার পরিবারের ৪০ হাজার মানুষ। ৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ৩টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বন্যায় প্রায় ১০০ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

default-image

নোয়ারপাড়া চরের আশ্রয়হারা মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যমুনা নদীর দুর্গম ভাঙ্গুরগাছা চরে বসতি ছিল ২০০ পরিবারের। ২০১৮ সালের বন্যায় ভাঙ্গুরগাছা চরের অর্ধেকটা যমুনাগর্ভে বিলীন হয়। পরের বছরের বন্যায় নিশ্চিহ্ন হয় চরের লোকালয়। বসতভিটা, বাড়িঘর, আবাদি জমি—সবকিছু হারিয়ে ভাঙ্গুরগাছা চরের লোকজন নতুন জেগে ওঠা নোয়ারপাড়া চরে বসতি গড়েন। ৩ মাস আগেও ৮০০ মানুষের আনাগোনায় মুখর ছিল নোয়ারপাড়া চর। প্রায় ১ বর্গ কিলোমিটার চরে আবাস ছিল ২০০ পরিবারের। ছিল একটি বিদ্যালয়, যার নাম ভাঙ্গুরগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এখন যমুনার ঢলে ভাসছে চরের লোকালয়। এখন সেখানে থই থই করছে পানি, নেই লোকালয়ের চিহ্ন।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলা সদরের কালিতলা ঘাট থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান ছিল নোয়ারপাড়া চরের। এখন নদীর ঢল সব নিয়ে গেছে। নোয়ারপাড়া চরের সালাম শেখ বলেন, ‘মায়ার বসতঘর। ছাড়তে মন চায় না, কিন্তু ঢলের সঙ্গে কুলাবার পারি না। ডিঙি নৌকায় কোনোরকমে কুলে আসে উঠচি। ঢলের পানি নামে গেলে কোন চরে ঘর তুলমো এখনো তা কবার পারিচ্চি না।’

চরের বাসিন্দা মোজাম মণ্ডল (৬০) বসতঘরের টিনের চালা নৌকায় তুলে এসে উঠছেন সোনাতলা উপজেলার সরলিয়া চরে। তিনি বলেন, ‘যমুনাত ভাইস্যা ভাইস্যা জীবনডা শ্যাষ। এই বয়সে ৩০ বার বসত ভাঙচি-গড়চি। ভাঙা-গড়ার এই জীবন আর কুলাবার পারি না। আশ্রয়কেন্দ্রে অ্যাকনা মাথা গোঁজাবার ঠাঁই পাইলে যমুনার জলে ভাসার অবসান হইত।’

default-image

জয়নাল সরদার (৬৫) বলেন, ‘এক হপ্তা ধরে যমুনার জলতবাস। বসতঘরত কোমরপানি। রোববার নদী সব ভাইস্যা নিয়ে গেচে। সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব এখন। তিন দিন আগে ইলিপের সামান্য চাল পাইচি। কিন্তু চুলাত আগুন ধরাবার মতো শুকনো জায়গা নাই। চিড়া–মুড়ি খ্যায়া দুই দিন কাটাইচি। শ্যাষে এটিতে আসে (শিমুলতাইড় গুচ্ছগ্রাম) উঠচি।’

নোয়ারপাড়া চরের ফজলুল হক আকন্দ (৪৮) বলেন, ‘আট দিন ধরেই যমুনা খ্যাপা। ঢলের পানি বসতঘরে। তবু ঘরের মায়ায় কেউ চর ছাড়েনি। রোববার পর্যন্ত সগলি চরেই আচলো। কিন্তু শ্যাষ রক্ষা হয়নি। যমুনার ঢলের দাপটের কাছে চরের মানুষ কূলে উটপার পারেনি। ফুসে ওঠা যমুনার গর্জনে একরাতে সব শ্যাষ। চর এখন বিরানভূমি, লোকালয়ে বয় যমুনার স্রোত।’

নোয়ারপাড়া চরের বাসিন্দা ও চালুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৪, ৫ ও ৬ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য আজেদা বেগম বলেন, যমুনার ঢলে নোয়ারপাড়া চর প্লাবিত হওয়ায় এখানকার লোকজন পাশের শিমুলতাইড়, সরলিয়া ও সুজনেরপাড়া আশ্রয়কেন্দ্রে খোলা আকাশের নিচে কোনোরকমে ঠাঁই নিয়েছেন। চর বিলীন হওয়ায় সহায়–সম্বল হারিয়ে দুর্গম এ চরের আশ্রয়হারা মানুষের এখন দুর্বিষহ দিন কাটছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী বলেন, এই দুর্গম চরে প্রায় ২০০ পরিবারের ৮০০ মানুষের বসবাস ছিল। যমুনার ঢলে চর তলিয়ে যাওয়ায় এখন তাঁরা দিশেহারা। নোয়ারপাড়া চর বিলীন হওয়ায় ভাঙ্গুরগাছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা উপকরণ ও আসবাব শিমুলতাইড় চরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যমুনার ভাঙন ও ঢলে প্লাবিত হওয়ায় গত কয়েক দিনে নোয়ারপাড়া চরের ২০০, দলিকার চরের ১৫০, হাটবাড়ি চরের ১০০, কাশিরপাড়া চরের ৬০, শিমুলতাইড় চরের ৫০ এবং মানিকদাইড় চরের ২০টি পরিবারসহ প্রায় ৬০০ পরিবারের আড়াই হাজার মানুষ এখন আশ্রয়হারা হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী হয়ে পড়েছে চরের ৪ হাজার ৭০০ মানুষ।

অন্যদিকে সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাসেল মিয়া বলেন, চরাঞ্চলের চালুয়াবাড়ি, কাজলা, কর্নিবাড়ি, বোহাইল, হাটশেরপুর ইউনিয়নের ৮২টি চরসহ চন্দনবাইশা, কামালপুর, কুতুবপুর ও সদর ইউনিয়নের দুর্গম চর এবং নদীর তীরবর্তী মোট ৫৬টি গ্রামের ৪০ হাজার মানুষ এখন পানিবন্দী। দুর্গম এলাকার পানিবন্দী মানুষের মধ্যে ৩৬ মেট্রিক টন চাল, ২০ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ১০০টি পানির জার বিতরণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের কয়েকটি চরের মানুষ। দুর্গম চর পরিদর্শন ও ত্রাণসহায়তা বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন