বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কারখানার মালিকেরা জানিয়েছেন, একসময় নারকেলের ছোবড়া শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হতো। তবে বর্ষায় ছোবড়া শুকাতে অসুবিধা হতো বলে তা ফেলে দেওয়া হতো। এই অঞ্চলে একসময় প্রচুর নারকেল উৎপাদিত হতো। আর এই নারকেলের ছোবড়ার ওপর ভিত্তি করে ২০০৬ সালে সদর উপজেলার চাউলিয়া এলাকায় দুটি কারখানা ছোবড়া থেকে আঁশ ও গুঁড়া তৈরি শুরু করে। পরে কারখানার সংখ্যা বেড়ে নয়টি হয়। তবে গত দুই-তিন বছর স্থানীয় বাজারে ছোবড়ার সংকট দেখা দেওয়ায় কারখানার সংখ্যা কমে গেছে। যশোরের রূপদিয়া, নওয়াপাড়া, মনিরামপুর, কেশবপুর ও খুলনার চুকনগর বাজার থেকে নারকেলের ছোবড়া সংগ্রহ করা হয়। তোশকের ভেতরের অংশ তৈরি হয় মূলত নারকেলের ফেলে দেওয়া ছোবড়ার আঁশ দিয়ে। নারকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ ছাড়াতে গেলে প্রচুর পরিমাণে গুঁড়া বের হয়। কৃষিকাজে বিশেষ করে ফুল চাষে এই গুঁড়ার আছে ব্যাপক চাহিদা।

default-image

কারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১ হাজার নারকেলের ছোবড়ায় ১৬০ থেকে ১৮০ কেজি আঁশ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ফেলনা উপজাত হিসেবে বের হয় ১২ কেজির মতো গুঁড়া। বর্তমানে একটি ছোবড়ার দাম চার থেকে পাঁচ টাকা। প্রতি কেজি আঁশ ৩০ থেকে ৩২ টাকা এবং প্রতি বস্তা (ছয় কেজির বস্তা) গুঁড়া ২০০ থেকে ২২০ টাকায় বিক্রি হয়। যশোর জেলার বিভিন্ন লেপ-তোশকের দোকানে এসব আঁশ বিক্রি হয়। বগুড়া, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় আঁশ পাঠানো হয়। দেশের মধ্যে ছোবড়া থেকে সবচেয়ে ভালো আঁশ উৎপাদিত হয় এখানে। গুঁড়া বিক্রি হয় জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী এলাকায় ফুল চাষে। এই গুঁড়া আর্দ্রতা ধরে রেখে ফুলের চারার শিকড় তৈরিতে বেশ কার্যকর।

২০০৮ সালে চাউলিয়া এলাকায় জমি ভাড়া নিয়ে কারখানা তৈরি করেন মো. আলামিন (২৬)। তাঁর কারখানায় কাজ করেন ১২ জন নারী শ্রমিক। এর মধ্যে একজন নারী যন্ত্রে ছোবড়া কেটে খণ্ড করার কাজ করেন। তাঁর মজুরি দিনে ২০০ টাকা। আর ছোবড়া থেকে আঁশ ছাড়ানোর জন্য একজন নারী মজুরি পান মণপ্রতি ৬০ টাকা। প্রতিদিন একজন নারী সর্বোচ্চ দুই মণ আঁশ ছাড়াতে পারেন। আর ছাড়ানো আঁশ পরিমাপ করে ২৫ কেজির গাঁট (বেল) বাঁধতে একজন নারী পান সাড়ে ৭ টাকা।

উপজেলার মুন্সেফপুর গ্রামের গৃহবধূ শাহানারা বেগম (৩৮) যন্ত্রে ছোবড়া কেটে খণ্ড করার কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। ছোট মেয়ে লেখাপড়া করছে। স্বামী ইঞ্জিনচালিত ভটভটি চালায়। যা টাকা পাই, তাতে আমার সংসার চলে যায়।’

চাউলিয়া গ্রামের লিপি খাতুনের পরিবারের সদস্য সংখ্যা তিন। স্বামী ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালান। তিনি বলেন, বাড়ির কাজের পাশাপাশি আঁশ ছাড়ানোর কাজ করেন তিনি। প্রতিদিন দুই মণ আঁশ হয়। এতে তাঁর দিনে আয় ১২০ টাকা, যা দিয়ে ভাত-কাপড় জোটে।

default-image

কারখানার মালিক মো. আলামিন বলেন, খরচ বাদ দিয়ে সব মিলিয়ে মাসে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার থাকে। কিন্তু গত দুই-তিন বছর স্থানীয় বাজারে ছোবড়ার সংকট দেখা দেওয়ায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে এটা সম্ভাবনাময় শিল্প। এই শিল্পে সরকারি সহায়তা পেলে সমৃদ্ধি ঘটবে।

২০০৬ সালে এলাকায় প্রথম কারখানা স্থাপন করে নারকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ ছাড়ানোর কাজ শুরু করেন চাউলিয়া গ্রামের নূর ইসলাম (৬২)। বর্তমানে তাঁর কারখানায় ১৫ জন নারী শ্রমিক কাজ করেন। কারখানায় যন্ত্রে ছোবড়া কেটে খণ্ড করার কাজ করেন চাউলিয়া গ্রামের গৃববধূ হাসিনা বেগম (৫০), রুমা খাতুন (৪০) ও আনোয়ারা বেগম (৪২)। তাঁরা জানালেন, বসে না থেকে কাজ করছেন। এ থেকে আয়ের টাকা দিয়ে সংসার চালাচ্ছেন।

শ্রীপদ্দী ঘোড়াগাছার গৃহবধূ ঝুমুর রায় বলেন, প্রতিদিন তিনি দুই মণের মতো আঁশ ছিঁড়তে পারেন। এতে তাঁর আয় হয় ১২০ টাকা। সংসারের কাজ সামলিয়ে তিনি এই কাজ করছেন। এতে চার সদস্যের পরিবার চলে।

ছোবড়ার গুঁড়া বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে বলে জানালেন কারখানার মালিক নূর ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, সরকারি সাহায্য ও সহযোগিতা পেলে এই শিল্প আরও সম্প্রসারিত হবে এবং আরও বেশিসংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান হবে।

default-image

আট বছর ধরে নারকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ দিয়ে গাঁট তৈরি করছেন চাউলিয়া গ্রামের বাবুল হোসেন (৪৪)। বর্তমানে তাঁর কারখানায় ১০ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। কাজের ফাঁকে চাউলিয়া গ্রামের গৃহবধূ ফিরোজা বেগম বলেন, সাত বছর ধরে এই কাজ করছেন তিনি। এ থেকে যা আয় হয়, সংসার মোটামুটি চলে।
কারখানার মালিক বাবুল হোসেন বলেন, সব খরচ খরচা বাদ দিয়ে মাসে গড়ে ২০ হাজার টাকা থাকে। তবে তোশক (ম্যাট্রেস) তৈরির বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি আঁশ কিনলে এবং গুঁড়া বিদেশে রপ্তানি করতে পারলে এই শিল্প দ্রুত প্রসার লাভ করত।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) যশোর কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. গোলাম হাফিজ বলেন, বিসিক বিদ্যমান ও নতুন শিল্প উদ্যোগকে সম্প্রসারণ, উন্নয়ন এবং প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দেয়। যশোর সদর উপজেলার চাউলিয়া এলাকায় গড়ে ওঠা নারকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ ও গুঁড়া তৈরির শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হবে। এ ব্যাপারে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন