যে অভিযান শেষ চূড়ান্ত বিজয়ে

এ এম জি কবির ভুলু
সংগৃহীত

গল্পটা এক যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার। সময় ১৯৭১ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার চেষ্টা ছিল বরিশাল সদর উপজেলার চর কমিশনার এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আঘাত হানার অভিযানে অংশ নেওয়া। তাঁদের একজনের নাম এ এম জি কবির ভুলু। যুদ্ধকালে অনেক সফল অভিযানের মধ্যে তাঁর এই অভিযান শুরু হয়েছিল ব্যর্থতা দিয়ে।

একাত্তরের ১৬ জুলাই সকালে একটি স্টেনগান, হ্যান্ড গ্রেনেডসহ নৌকায় করে আগৈলঝাড়া থেকে কবির ভুলুদের গন্তব্য ছিল চর কমিশনার। সঙ্গে ছিলেন সহযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন আর নৌকার মাঝি মেহের আলী। পথে গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর খালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তাঁরা। ওই দিনই তাঁদের নিয়ে রাখা হয় গৌরনদী কলেজের সেনাক্যাম্পে। সেখান থেকে বাটাজোর সেনাক্যাম্প ও পরে বরিশাল নগরের ওয়াপদা কলোনির টর্চার সেলে। সেখানে টানা ১৯ দিন তাঁদের ওপর চলে অসহনীয় নির্যাতন।

মুক্তিযুদ্ধের ৪৯ বছর পরও ওই টর্চার সেলের দুঃসহ স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়ায় কবির ভুলুকে। বর্তমানে বরিশাল নগরের কালীবাড়ি সড়কের শীতলাখোলা এলাকার বাসিন্দা কবির ভুলু গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে এই প্রতিবেদককে সে গল্পই শোনান।

কবির ভুলু বলেন, ১৬ জুলাই সকাল সাড়ে ৮টা কি ৯টা। তাঁদের বহনকারী নৌকা এগিয়ে চলছিল বাটাজোর খাল ধরে। পথে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নৌকা থামায়। মাঝিকে জিজ্ঞাসা করে কোথায় যাওয়া হচ্ছে। মাঝির পক্ষ থেকে বলা হয়, নৌকায় রোগী আছে। চিকিৎসার জন্য পাশের এলাকা সরিকল যাচ্ছেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা তাতে সন্তুষ্ট হয় না। তারা নৌকা তল্লাশি শুরু করে। একপর্যায়ে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রের সন্ধান পায়। সেখানেই থেমে যায় চর কমিশনার অভিযান।

কবির ভুলু বলছিলেন, নৌকা থেকে তুলে পিঠমোড়া করে খালের কিনারে তোলা হয় তাঁদের। সেখান থেকে নেওয়া হয় গৌরনদী কলেজের ক্যাম্প, বাটাজোর ও সবশেষে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড সেনাক্যাম্পের টর্চার সেলে। প্রতিদিনই সেলে চলত সীমাহীন নির্যাতন। রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করা হতো। পিঠমোড়া করে বেঁধে যতক্ষণ জ্ঞান থাকত, ততক্ষণ চলত নির্যাতন। সহযোদ্ধা আনোয়ার নির্যাতনে মারা যান। আর কিছুদিন পর ছেড়ে দেওয়া হয় নৌকার মাঝি মেহেরকে।

চর কমিশনার অভিযানে যোগ দেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার আগে মে মাসে স্বরূপকাঠির কুড়িয়ানা বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্পে ছিলেন কবির ভুলু। সেখানে বাউকাঠি এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। যুদ্ধের পরদিন পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ক্যাম্প ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র নিয়ে যে যাঁর মতো পালিয়ে যান। সঙ্গে থাকা এলএমজি নিয়ে কবির ভুলু যান আগৈলঝাড়ায় গ্রামের বাড়ি। সেখানে অস্ত্রটি মাটিচাপা দিয়ে রেখে ফিরে আসেন সদর উপজেলার চর কমিশনার এলাকার করিম হাওলাদারের বাড়িতে। সেখানে শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা মিলিত হয়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রস্তুতি নেন। এরই একপর্যায়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখা অস্ত্র আনতে আবার গ্রামের বাড়িতে যান। সেখান থেকে চর কমিশনারে ফেরার পথেই গৌরনদীর বাটাজোর খালে ধরা পড়েন তিনি।

কবির ভুলু বলেন, ধরা পড়ার ১৯ দিন পর তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় যশোর ক্যান্টনমেন্টে। সেখান থেকে নিয়ে রাখা হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে। ২১ অক্টোবর কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি। ছাড়া পেয়ে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া ক্যাম্পে গিয়ে আবার যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। দেশ স্বাধীনের যে অভিযান শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বর।