default-image

মাদারীপুরের কালকিনিতে যৌতুকের তিন লাখ টাকা না পাওয়ায় এক গৃহবধূকে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে দুই চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা করেছেন তাঁর স্বামী। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই গৃহবধূকে বরিশালের শের-ই–বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গত শনিবার সাদিয়ার শ্বশুরবাড়ি বালিগ্রাম ইউনিয়নের গুঙ্গিয়াকুলএলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর থেকেই পলাতক তাঁর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূর নাম সাদিয়া বেগম (২১)। তিনি কালকিনি উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বনগ্রাম এলাকার কৃষক বারেক চৌকিদারের মেয়ে। গতকাল রোববার বিকেলে সাদিয়ার মা পারভীন বেগম ডাসার থানায় আটজনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। মামলায় ওই গৃহবধূর স্বামী নাসির মোল্লাকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সাদিয়ার পরিবার যৌতুকের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গৃহবধূ সাদিয়ার ওপর নির্যাতনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন নাসির। সর্বশেষ শনিবার দুপুরে ক্ষিপ্ত হয়ে পরিবারের লোকজনের সহায়তায় সাদিয়াকে বেদম মারধর ও দুই চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালান নাসির।

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বনগ্রাম এলাকার কৃষক বারেক চৌকিদারের মেয়ে সাদিয়ার সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বালিগ্রাম ইউনিয়নের গুঙ্গিয়াকুল এলাকার কাসেম মোল্লার প্রবাসী ছেলে নাসির মোল্লার বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন সময় স্বামী নাসির সাদিয়াকে যৌতুকের তিন লাখ টাকার জন্য চাপ দিতে শুরু করেন। সাদিয়ার পরিবার যৌতুকের টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে গৃহবধূ সাদিয়ার ওপর নির্যাতনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন নাসির। সর্বশেষ শনিবার দুপুরে ক্ষিপ্ত হয়ে পরিবারের লোকজনের সহায়তায় সাদিয়াকে বেদম মারধর ও দুই চোখ উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালান নাসির। এতে সাদিয়ার দুই চোখ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বিজ্ঞাপন

গৃহবধূর চিৎকার শুনে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল দেন প্রতিবেশীরা। খবর পেয়ে ডাসার থানা-পুলিশ সাদিয়াকে উদ্ধার করে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। অবস্থার অবনতি হলে ওই দিনই তাঁকে পাঠানো হয় বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই দিনই পালিয়ে যান সাদিয়ার স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন। পরে সাদিয়ার মা পারভীন বেগম বাদী হয়ে নাসির মোল্লাসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে ডাসার থানায় নারী নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা করেন। এ ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

সাদিয়া চোখ খুলতে পারছিলেন না। কর্নিয়া লাল ছিল। ব্লিডিং (রক্তক্ষরণ) হচ্ছিল। দুই চোখেই আঘাত গুরুতর মনে হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই আমরা।
তানভির আহমেদ, আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

মামলার বাদী নির্যাতনের শিকার সাদিয়ার মা পারভীন বেগম আজ সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জামাতা নাসিরের দাবিকৃত যৌতুকের টাকা দিতে না পারায় আমার মেয়েকে দিনের পর দিন শারীরিক নির্যাতন করেছে। আমার মেয়ে লেখাপড়া করতে চাইত। এর জন্য তাকে আরও বেশি মারত। মারতে মারতে আমার মেয়ের চোখ দুইটাও বাকি রাখে নাই। জানি না মেয়েটা আমার আর চোখে দেখতে পারবে কি না। যারা আমার মেয়েকে এভাবে নির্যাতন করেছে, আমি সবার বিচার চাই।’

কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা তানভির আহমেদ আজ বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাদিয়া চোখ খুলতে পারছিলেন না। কর্নিয়া লাল ছিল। ব্লিডিং (রক্তক্ষরণ) হচ্ছিল। দুই চোখেই আঘাত গুরুতর মনে হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালের শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দিই আমরা।’

সাদিয়ার স্বামী নাসির মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পলাতক। নাসিরের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

বরিশালে সাদিয়ার সঙ্গে রয়েছেন তাঁর ভাই মো. সবুজ। আজ বিকেলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রোববার রাতে আপুর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে। চিকিৎসক চোখের জন্য দুটি পরীক্ষা দিয়েছে। কাল মঙ্গলবার জানা যাবে আপুর চোখের অবস্থা। এখন ও কিছুই দেখতে পারছে না। চোখ ফুলে আছে। আমার আপুকে যারা যৌতুকের তিন লাখ টাকার জন্য অমানবিক নির্যাতন করেছে, আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।’

সাদিয়ার স্বামী নাসির মোল্লা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা পলাতক। নাসিরের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘৯৯৯-এর মাধ্যমে ফোন পেয়েই আমরা ঘটনাস্থল থেকে ওই গৃহবধূকে উদ্ধার করি এবং নির্যাতনের সত্যতা পাই। পারিবারিক কলহ ও যৌতুকের জন্য মেয়েটিকে তাঁর স্বামী মারধর করেন এবং তাঁর দুই চোখে আঘাত করেন বলে আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। নির্যাতনের শিকার সাদিয়া এখন বরিশাল মেডিকেলে চিকিৎসাধীন। মামলার আসামিরা এলাকায় নেই, তাঁরা পলাতক। তবে আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন