রাজনীতির ছায়ায় কুষ্টিয়ার অলিগলিতে কিশোর অপরাধ
কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায় অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া লাবিব আলমাসকে (১৪) বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে সমবয়সী কয়েকজন মারধর করছে—ফেসবুকে এমন ভিডিও চিত্র ছড়িয়ে পড়লে থানায় মামলা হয়। পুলিশ চারজনকে আদালতে পাঠায়। আদালত শর্ত সাপেক্ষে তাদের জামিন দেয়। এ ঘটনা গত ১৮ নভেম্বরের। লাবিবের বাড়ি শহরের থানাপাড়ায়। শহরের মজমপুর এলাকার হৃদয় হোসেনকে (১৬) গত ১২ নভেম্বর দিনে-দুপুরে ছুরিকাঘাত করা হয়। বর্তমানে সে ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এখানেও যারা ঘটনা ঘটিয়েছে, সবাই কিশোর। তারিকুল ইসলামের বয়স ১৬ বছর। শহরের এন এস সড়কে প্রসাধনীর দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করত সে। বাড়ি কুঠিপাড়ায়। এই কিশোরের সঙ্গে গত ৩ জুলাই ফুটবল খেলা নিয়ে বন্ধুদের বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে কয়েকজন কিশোর তাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে।
কুষ্টিয়ার অলিগলিতে এখন কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য। এলাকাগুলো অনেকটা নিজেদের মতো বাঁটোয়ারা করে নিয়েছে তারা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কিশোর দলের সদস্যদের বেশির ভাগই নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মিছিলে আসা-যাওয়া ঘিরে তারা এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করে। এরপর কিশোর দল তৈরি হয়। এরপর রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’দের দাপটে এলাকায় নানা অপকর্ম আর নিজেদের মধ্যে মারামারি করে বেড়াচ্ছে তারা।
শহরে যাতে কিশোরেরা অপরাধ করতে না পারে, সে জন্য তালিকা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক শেল্টার না পেলে কিশোর অপরাধ একেবারেই কমে যাবে।এস এম তানভীর আরাফাত, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার
জেলার পুলিশ সুপার এস এম তানভীর আরাফাত বলেন, বেশ কিছু ঘটনায় কিশোর অপরাধীদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। শহরে যাতে কিশোরেরা অপরাধ করতে না পারে, সে জন্য তালিকা তৈরি হচ্ছে। রাজনৈতিক শেল্টার না পেলে কিশোর অপরাধ একেবারেই কমে যাবে।
গত তিন বছরে জেলা ছাত্রলীগের পাঁচজন নেতাকে অপকর্মের কারণে বহিষ্কার করা হয়। তাঁদের প্রায় সবারই কিশোর দল রয়েছে। জানতে চাইলে সদ্য বিলুপ্ত হওয়া জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইয়াসির আরাফাত বলেন, ‘এটা ঠিক, সংগঠনের মধ্যে দু-একজন নেতা কিশোর দলের সদস্যদের শেল্টার (প্রশ্রয়) দেন। তাঁদের অবশ্যই আইনের আওতায় নেওয়া উচিত।’
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তথ্যমতে, শুধু কুষ্টিয়া শহরেই কিশোরদের ১৬টি দল রয়েছে। আর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্যমতে, কিশোরদের দলের সংখ্যা ১৩। সংখ্যার তারতম্য থাকলেও কাজে–কর্মে এরা এক রকম। প্রতিটি দলে ২০ থেকে ২৫ জন করে সদস্য রয়েছে। এসব দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৮ বছরের বেশি বয়সী তরুণেরা। তাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের তথ্যমতে, শুধু কুষ্টিয়া শহরেই কিশোরদের ১৬টি দল রয়েছে। আর জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) তথ্যমতে, কিশোরদের দলের সংখ্যা ১৩। সংখ্যার তারতম্য থাকলেও কাজে–কর্মে এরা এক রকম। প্রতিটি দলে ২০ থেকে ২৫ জন করে সদস্য রয়েছে। এসব দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ১৮ বছরের বেশি বয়সী তরুণেরা। তাঁরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়া পৌরসভার থানাপাড়া, সিঙ্গার মোড়, ইসলামিয়া কলেজ ও কোর্টস্টেশন গলি, থান ও ছয় রাস্তার মোড় এবং হরিপুর সেতুর পূর্ব ও পশ্চিম পাশে ব্যাক স্ট্রিট বয়েজ নামে একটি দলের কর্মকাণ্ড বেশি। শহরের পূর্ব মজমপুর, সাদ্দাম বাজার, সকাল-সন্ধ্যা, ঝাউতলা ও র্যাব গলি, হাসপাতাল ও আলফার মোড় এবং বিআরটিসি কাউন্টারের পেছনে ব্যাড বয়েজ ও বিএসবি নামের দলের তৎপরতা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় এইচএসবি, আরএলবি, সিডব্লিউবি, আরডিএকস, আরডেন্ট বয়েজ, কেসিবি, ডিবি, কেকেজি, ভিডিএলইএমবি ও জিরো জিরো সেভেন নামের দলের তৎপরতা রয়েছে। বিভিন্ন বাড়ির সীমানাপ্রাচীরে এসব দলের নামে চিকাও রয়েছে। দামি মোটরবাইক নিয়ে শহরে দ্রুতগতিতে মাঝেমধ্যে মহড়া দেয় এসব দলের সদস্যরা।
এসব দলে যাঁরা নেতৃত্বে দিচ্ছেন—এমন কয়েকজন তরুণের নাম উঠে এসেছে পুলিশের অনুসন্ধানে। তাঁদের মধ্যে আড়ুয়াপাড়ার সজীব শেখ ছিলেন জেলা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক। আর ঈদগাহ পাড়ার আজমল জেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পরে দল থেকে বহিষ্কৃত হন। থানাপাড়ার আবু সাঈদ ওরফে টুটুল (২৬) ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কিশোর দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। একসময় সবচেয়ে বড় কিশোর দল ছিল তাঁর। নানা অপকর্ম করে তিনি জেলও খেটেছেন। বর্তমানে কিশোর দলের সবচেয়ে বড় দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আলফামোড় এলাকার জীবন আহমেদ। তিনি একাধিক কিশোর দলের পৃষ্ঠপোষক। তিনি ঢাকার একটি কলেজে পড়তেন। কুষ্টিয়ায় এলে দলবল নিয়ে চলেন। সপ্তাহখানেক আগে মজমপুর এলাকায় হৃদয়কে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় নেতৃত্ব দেন রাতুল ও লাম। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে তাঁরা কারাগারে আছেন।
করোনা পরিস্থিতিতে স্কুল ও কলেজ বন্ধ থাকায় কিশোরেরা এমন বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে মনে করেন কুষ্টিয়া আদালতের সরকারি কৌঁসুলি অনুপ কুমার নন্দী। তিনি বলেন, কিশোরদের ব্যাপারে অভিভাবকদের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজের ভূমিকা রয়েছে। রাজনীতিবিদদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। তাহলেই কমে যাবে কিশোরদের অপরাধ।