default-image

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেছেন, ‘গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়ার পেছনে রাজনৈতিক কারণ আছে। আমাদের দেশই তো স্বীকার করেনি ৩০ বছর। বিএনপি যখন ক্ষমতায় ছিল, তারা কখনোই গণহত্যার ওপর জোর দেয়নি। কারণ গণহত্যার ওপর জোর দিতে হলে যারা হত্যাকারী, তাদের কথা আসতে হবে। এটা তো তারা বলতে পারে না।’

আজ সোমবার রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে ‘গণহত্যার পাঁচ দশক: স্বীকৃতি, বিচার ও ইতিহাসের দায়’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠান শেষে প্রথম আলোকে এসব কথা বলেন মুনতাসীর মামুন। তিনি বলেন, গণহত্যা নিয়ে এখনো ব্যাপক গবেষণা হয়নি। গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি বারবার বলে লাভ নেই। গণহত্যার সব তথ্য সমন্বিত করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে মানুষ জানে। তবেই স্বীকৃতি পাওয়া যাবে।

গণহত্যা জাদুঘরের সভাপতি অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন সেমিনারে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ‘পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ও পরে তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একাত্তরের গণহত্যার বিষয়টিকে বিস্মৃত করে দিতে চেয়েছেন। কারণ, গণহত্যার বিষয়টি থাকলে তাঁদের রাজনীতি থাকে না। গণহত্যার কথা থাকলে আলবদর, আলশামস বা রাজাকার বা অন্য যারা কাজ করছে, যারা এই খুনের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কথা চলে আসে।’

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে দুটি অধিবেশনের প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি ও গণহত্যা জাদুঘরের ট্রাস্টি শাহরিয়ার কবির।

বিজ্ঞাপন

প্রথম অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কে এম খালিদ বলেছেন, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জেলা জরিপ। গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নির্মম এই ইতিহাস নিয়ে এত বিস্তর কাজ আর হয়নি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় এই গবেষণা কেন্দ্র ২৮টি জেলায় জরিপের কাজ সম্পন্ন করেছে এবং বই আকারে প্রকাশ করেছে। এই ২৮টি জেলায় গণহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে প্রায় ১৩ হাজার ৮৫৪টি।

প্রতিটি গণহত্যায় গড়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন শহীদ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি ৩৬টি জেলায় জরিপের কাজ সম্পন্ন হলে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে হলেও এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সবাই যদি সমানভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রক্ষায় সচেতন হয়, তাহলে নতুন করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি আর মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধও সম্ভব হবে।

মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার নতুন তথ্য উঠে আসে ১৯৭১ গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও গণহত্যা জাদুঘরের জরিপে।

default-image

নতুনভাবে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, মুন্সিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল—এই আটটি জেলায় ৭ হাজার ২৪৫টি গণহত্যা ও নির্যাতনের ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। নতুন এই ৮টি জেলা জরিপসহ এখন পর্যন্ত গণহত্যা জাদুঘর ২৮টি জেলা জরিপ সম্পন্ন করেছে। আগে ২০টি জেলায় যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল তা হলো, গণহত্যা ৫ হাজার ১২১টি, বধ্যভূমি ৪০৪টি, গণকবর ৫০২টি ও নির্যাতন কেন্দ্র ৫৪৭টি।
২৮টি জেলায় প্রাথমিক জরিপ অনুসারে গণহত্যা ১১ হাজার ৩৫৬টি, বধ্যভূমি ৬৫৪টি, গণকবর ৮৪৬টি ও নির্যাতন কেন্দ্র ৯৯৮টি।

১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও গণহত্যা জাদুঘরের ট্রাস্টি সম্পাদক ড. চৌধুরী শহীদ কাদের প্রথম আলোকে বলেন, সরকারিভাবে নির্দিষ্ট করে গণহত্যার কোনো হিসাব নেই। এর আগে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের গবেষণায় ৯৫২টি গণহত্যার তথ্য উঠে এসেছিল।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপক শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘ধর্ম, বর্ণ, জাতিসত্তা, ভাষা, অঞ্চল যে কারণেই হোক, বিশ্বকে গণহত্যার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে গণহত্যার স্বীকৃতি জরুরি। এই স্বীকৃতি গণহত্যায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পাশাপাশি দেশে দেশে গণহত্যাকারীদের বিচারের পথ সুগম করবে। একই সঙ্গে অপরাধ থেকে দায়মুক্তির কলঙ্ক থেকে ইতিহাসকে মুক্ত করবে।’

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তপন কান্তি ঘোষ। দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক মামুন সিদ্দিকী, লেখক ও গবেষক আহম্মেদ শরীফ এবং গণহত্যা জাদুঘর ট্রাস্টি সম্পাদক ড. চৌধুরী শহীদ কাদের।

দ্বিতীয় অধিবেশনে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক গণহত্যা জাদুঘরের কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, ‘জরিপে যেভাবে নতুন নতুন গণহত্যার তথ্য ও স্থান চিহ্নিত হচ্ছে, তাতে শহীদের সংখ্যা নিয়ে আর কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পাবে না। এখন এসব স্থান রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।’ এ সময় তিনি সরকারের পক্ষ থেকে গণহত্যা জাদুঘরের কার্যক্রম পরিচালনায় সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

সম্প্রতি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আন্দোলনের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনাদের গায়ের জ্বালা আমরা বুঝেছি। ভারত যদি আমাদের সাহায্য না করত, ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা না করত, এক কোটি লোককে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় না দিত, তাহলে নয় মাসে দেশ স্বাধীন হতো না। নয় বছর লাগতে পারত। আর ৩০ লাখ না আরও বহু মানুষ শহীদ হতো। আসল জায়গাটা এটা। ভারত কেন মুক্তিযুদ্ধে সাহায্য করেছে।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন