default-image

নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যিক শহর বেগমগঞ্জের চৌমুহনীকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করে দ্বিতীয় দফায় লকডাউন দিয়ে ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে পড়েছে প্রশাসন। ব্যবসায়ীরা সারা দেশের লকডাউন শিথিলের বিষয়টি তুলে ধরে চৌমুহনীর লকডাউন প্রত্যাহার বা শিথিলের দাবি জানিয়েছেন। সূত্র মতে, এ দাবি নিয়ে ১ জুন স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। 

আজ বুধবার অনেক ব্যবসায়ী লকডাউন ভঙ্গ করে দোকানপাট খুলেছেন বলে জানা গেছে।


এদিকে জেলার করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘হটস্পট’ বেগমগঞ্জ উপজেলায় প্রতিদিনই বাড়ছে কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন শনাক্ত হয়েছে ৪৩ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন একজন। জেলার মোট আক্রান্তের ৪৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ (৩৬৯ জন) বেগমগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। মারাও গেছেন সেখানে সর্বাধিক ৯ জন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেখানে লকডাউন অব্যাহত রাখতে গিয়ে রীতিমতো ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে পড়েছে স্থানীয় প্রশাসন। এ অবস্থায় লকডাউন শিথিল করা হলে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির আশঙ্কা করছে স্বাস্থ্য বিভাগ। গতকাল মঙ্গলবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির বৈঠকে স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের আশঙ্কার কথা জানায়। বৈঠকে চৌমুহনী পৌরসভার মেয়র ও ব্যবসায়ী নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। এ সময় স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে অন্তত ৭ জুন পর্যন্ত লকডাউন বহাল রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

উপজেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চৌমুহনীতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে চৌমুহনীকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ‘রেড জোন’ ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস। তাঁর নির্দেশে গত ২২ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চৌমুহনীর ওষুধ ও কাঁচা তরকারির দোকান ছাড়া সব পাইকারি পণ্যের দোকান এবং অন্যান্য দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরপরও পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৩০ মে জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী নেতা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে স্থানীয় প্রশাসন লকডাউনের মেয়াদ ৭ জুন পর্যন্ত বাড়ায়। ওই বৈঠকেও ব্যবসায়ীরা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানান এবং প্রশাসনকে সহযোগিতার কথা বলেন।

সূত্র জানায়, ওই বৈঠকের পর দুদিন না পেরোতেই ১ জুন ব্যবসায়ী সমিতির নেতারাসহ ২৫-৩০ জন ব্যবসায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে জড়ো হন। তাঁরা ইউএনওকে সারা দেশের লকডাউন শিথিলের বিষয়টি তুলে ধরে চৌমুহনীর লকডাউন প্রত্যাহার বা শিথিল করার দাবি জানান এবং নানাভাবে ইউএনওর প্রতি চাপ সৃষ্টি করেন।

একপর্যায়ে ইউএনও করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির বৈঠক ডেকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলে ব্যবসায়ীদের শান্ত করেন বলে ওই সূত্র জানায়। সে অনুযায়ী বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ইউএনওর কার্যালয়ে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সদস্যসচিব উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অসীম কুমার দাশ সংক্রমণ রুখতে লকডাউন বহাল রাখার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেন।

একই ভাবে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন-উর-রশিদ চৌধুরীও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কমাতে লকডাউন বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। এ সময় ব্যবসায়ী নেতারা প্রথমে সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা, পরে দুপুর ১২টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানান এবং শেষ পর্যন্ত তাঁদের দাবির প্রতি অনড় থাকেন। এরপর কার্যত কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই বেলা একটার দিকে বৈঠকটি শেষ হয়ে যায়।


স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ৩০ মে ব্যবসায়ীরা আরও ৭ দিনের জন্য দোকানপাট ও আড়ত বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু স্থানীয় একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার জন্য পেছন থেকে ব্যবসায়ীদের নানাভাবে ইন্ধন দিচ্ছেন। যার কারণে ব্যবসায়ীরা দুই দিনের মাথায় সিদ্ধান্ত থেকে সরে গিয়ে প্রশাসনের কাছে লকডাউন শিথিলের দাবি নিয়ে গেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চৌমুহনী ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি কবির আহমদকে গতকাল বিকেলে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তবে ওই বৈঠকে উপস্থিত চৌমুহনী ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল খায়ের জানিয়েছেন, ছোট ব্যবসায়ীদের চাপের কারণে তাঁরা ইউএনও কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। আজ বুধবার সকালে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, দু্ই মাসের বেশি সময় ধরে লকডাউন বহাল থাকায় ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এ কারণে তাঁরা বাধ্য হয়ে লকডাউন প্রত্যাহার বা শিথিলের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেন, স্বাস্থ্য বিধি মেনে আজ অনেক ব্যবসায়ী লকাডাউন ভঙ্গ করে দোকানপাট খুলতে শুরু করেছেন।


ইউএনও মো. মাহবুব আলম বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে লকডাউন প্রত্যাহার কিংবা শিথিল কোনোটিই করা হয়নি। এখন মাঠে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা।


এ ব্যাপারে বেগমগঞ্জ থানার ওসি হারুন-উর-রশিদ চৌধুরী বলেন, পুলিশ রাস্তায় অবস্থান করে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।


ব্যবসায়ীদের চাপে প্রশাসন পিছু হটল কি না, জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক তন্ময় দাস বলেন, প্রশাসন পিছু হটেনি। পিছু হটার কোনো কারণ নেই। ব্যবসায়ীরা বৈঠকের দুদিনের মাথায় কেন সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেন, তা তাঁরও বোধগম্য হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন