লাফার্জ হোলসিমের বিরুদ্ধে খোলাবাজারে চুনাপাথর বিক্রির অভিযোগ

লাফার্জ হোলসিমের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন সিলেটের ব্যবসায়ীরা। আজ বিকেলে নগরীর লামাবাজার এলাকার একটি হোটেলে ব্যবসায়ীদের পক্ষে কথা বলেন সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আহমদ শাখাওয়াত চৌধুরী
ছ‌বি: প্রথম আলো

বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জ হোলসিমের বিরুদ্ধে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে চুনাপাথর বিক্রি করার অভিযোগ উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উৎপাদনমুখী শিল্পের কাঁচামাল ঘোষণা দিয়ে সরকারকে কর কম দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে খোলাবাজারে চুনাপাথর বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি।

আজ বুধবার বিকেল চারটায় সিলেট নগরের লামাবাজার এলাকার একটি হোটেলের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পাথর আমদানিকারকদের সংগঠন ব্যবসায়ী-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতারা এ অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আহমদ শাখাওয়াত চৌধুরী।

আহমদ শাখাওয়াত চৌধুরী বলেন, চুনাপাথর আমদানি ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা সরকারকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) নির্ধারিত ভ্যাট ও অগ্রিম কর দিয়ে ব্যবসা করছেন। কিন্তু তাঁদের জানামতে, চুনাপাথরের ব্যবসা করার জন্য সরকারের কাছ থেকে লাফার্জ হোলসিম কোনো ধরনের অনুমতি পায়নি। শুধু সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য তারা মেঘালয় থেকে চুনাপাথর আমদানি করে। এ জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে তারা চুক্তিবদ্ধ হলেও চুনাপাথর ভেঙে (এগ্রিগেট) খোলাবাজারে বিক্রি করছে তারা। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি মেরে প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে চুনাপাথরের খোলাবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ জন্য চুনাপাথর ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত।

সুনামগঞ্জ চেম্বারের এই নেতা বলেন, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা ভোলাগঞ্জ, তামাবিল শুল্ক স্টেশন, সুনামগঞ্জের ছাতক, চেলা, ইছামতি, বড়ছড়া ও বাগলি দিয়ে চুনাপাথর আমদানি করে ক্র্যাশিং বা এগ্রিগেট পদ্ধতিতে যুগ যুগ ধরে খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছেন। বর্তমানে বৃহত্তর সিলেটের পাঁচ শতাধিক ক্র্যাশার মেশিন ও লক্ষাধিক ব্যবসায়ী-শ্রমিক এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। লাফার্জ হোলসিম সিমেন্ট উৎপাদন ও বিপণনের জন্য নিবন্ধিত একটি কোম্পানি। সিমেন্ট উৎপাদনের জন্য তাদের বাংলাদেশের জমি, গ্যাস প্রভৃতি ব্যবহারের অনুমতি আছে। প্রতিষ্ঠানটি তাদের সিমেন্ট ক্লিংকার উৎপাদনের কাঁচামাল চুনাপাথর মেঘালয় থেকে আমদানি করে।

সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, করোনা মহামারির পর থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্ল্যান্ট বসিয়ে ক্র্যাশিং করে ক্লিয়ার এগ্রিগেটের নামে চুনাপাথর খোলাবাজারে বিক্রি শুরু করছে। ফলে বৃহত্তর সিলেটের শুল্ক স্টেশনের সব আমদানিকারকেরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। পাথর ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পাঁচ শতাধিক ক্র্যাশার মিলের ব্যবসায়ীরা দুই হাজার কোটি টাকার মতো পুঁজি হারিয়ে দেউলিয়া হওয়ার মুখে। এ জন্য লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন।

ব্যবসায়ীদের পক্ষে আহমদ শাখাওয়াত চৌধুরী বলেন, ‘লাফার্জ হোলসিম বর্তমানে দিনে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার ঘনফুট চুনাপাথর ক্র্যাশিং করে সরবরাহ করছে। লাফার্জের কনভেয়ার বেল্টের মাধ্যমে আমদানি করার ফলে তাদের খরচ প্রতি টনে ১ হাজার ৭০০ টাকা। অন্যদিকে আমদানি, ক্র্যাশিংসহ আমাদের খরচ পড়ে ৩ হাজার ৭০০ টাকা। ফলে বাজারে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং সাধারণ ব্যবসায়ীরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’

এ বিষয়ে ব্যবসায়ীরা পরিকল্পনামন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, এনবিআর, এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি, সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ সাংসদ, ছাতক পৌরসভার মেয়রসহ স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার কথা বিবেচনা করে লাফার্জ হোলসিমের অবৈধ ব্যবসা দ্রুত বন্ধ করতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে লাফার্জ হোলসিম চুনাপাথর দিয়ে চুন প্রস্তুত করবে। তারা চুনশিল্পেও সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে।

সংবাদ সম্মেলনে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ জেলার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নেতা, ব্যবসায়ী-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের নেতা ও সব শুল্ক স্টেশনের ব্যবসায়ীরা উপস্থিত ছিলেন।

এ বিষয়ে লাফার্জ হোলসিমের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক (গণসংযোগ) তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে সন্ধ্যায় যোগাযোগ করা হলে তিনি চুনাপাথর ব্যবসায়ীদের অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তিনি মৌখিকভাবে কোনো বক্তব্য দেবেন না জানিয়ে বলেন, লিখিতভাবে বক্তব্য প্রস্তুত করা রয়েছে। প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দেশনা পাওয়ার পরে সেটি পাঠানো হবে।