আনারুলের মতো রংপুরের তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জে এবারে কোরবানির ঈদ ঘিরে গরু মোটাতাজা করে অনেক খামারি ধরা খেয়েছেন। কেউ কেউ গরু পুষে বিক্রি করতে পারেননি। এসব খামারির মনে ঈদের আমেজ নেই। গরু বিক্রি করতে না পারায় এসব খামারি বেকায়দায় পড়েছেন। অনেকে বাধ্য হয়ে কম দামে আবার কেউ মাংস ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, এবারে তারাগঞ্জের পাঁচটি ইউনিয়ন পরিষদে ১ হাজার ২৩১ জন খামারি ও কৃষক ঈদুল আজহায় কোরবানির উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য ১৫ হাজার ৩০০টি গরু প্রস্তুত করেন । কিন্তু স্থানীয়ভাবে চাহিদা ছিল ৯ হাজার গরুর। বদরগঞ্জে আড়াই হাজার খামারি ও কৃষক মিলে গরু প্রস্তুত করেন অন্তত ৩৫ হাজার। চাহিদা ছিল ২২ হাজার।

কৃষক, খামারি, ব্যবসায়ী ও হাট ইজারাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জের পশুর হাটগুলোতে বড় গরুর ক্রেতা আসেন ঢাকা, ফেনী, সিলেট ও চট্টগ্রাম থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিসহ নানা কারণে এবারে তারাগঞ্জ ও বদরগঞ্জের কোরবানির পশুর হাটে এসব ব্যবসায়ীর আনাগোনা ছিল অনেকটা শূন্যের কোঠায়। তাই চাহিদার অতিরিক্ত গরু ও উচ্চমূল্যের মোটাতাজা গরু বিক্রি কম হয়েছে। ফলে গরু পালনকারীরা এবার বিপাকে পড়েছেন।

তারাগঞ্জের পোদ্দারপাড়া গ্রামের খামারি হামিদুল ইসলাম বলেন, ‘ছয়টি গরুর একটিও বিক্রি করতে পারিনি। প্রতিদিন গরুকে খাওয়াতে ৪০০ টাকা খরচ হয়। একেকটি গরুর ওজন ৫-৬ মণ। হাটে প্রতিটি গরুর দাম হাঁকিয়েছে ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা। লোকসান হওয়ায় বিক্রি না করে বাড়িতে এনে রেখেছি। এখন গোখাদ্যের ঊর্ধ্বমুখী দামে গরুগুলো পুষব কেমন করে, তা নিয়ে সমস্যায় পড়েছি।’

তারাগঞ্জের লক্ষ্মীপুর গ্রামের ইউপি সদস্য খামারি মিলন মিয়া বলেন, ‘এবার যাঁরাই গরু মোটাতাজা করেছেন, তাঁরাই ধরা খেয়েছেন। লালনপালনের খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম ছিল।’

এবারে গরু পুষে চোখ ছলছল করছে বদরগঞ্জের কাঁচাবাড়ি গ্রামের আবেদ আলীর। ৪টি গরু ঘরে রেখে মোটাতাজা করলেও কোরবানির হাটে বিক্রি করতে পারেননি তিনি। অবশেষে পাওনাদারের চাপে বাধ্য হয়ে তিনি গরুগুলো কসাইকে দিয়েছেন।

আবেদ আলী বলেন, ‘ভাই, ধারদেনা ও এনজিওর ঋণ নিয়া গরু কিনছি। খুব আশা ছিল গরু বিক্রি করি কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাভ থাকবে। কিন্তুক লাভ তো দূরের কথা, উল্টা ৪০ হাজার টাকা গরু বেচেয়া লস খাছি। না বেচেয়া বুদ্ধি ছিল না। গরু থুইলে খরচ আরও বাড়ত। পাওনাদারের চাপও ছিল। অ্যালা লস পোষামো কেমন করি বুদ্ধি পাওচি না।’

বদরগঞ্জের আমরুলবাড়ি গ্রামের কৃষক মাজেদ আলী বলেন, ‘ভাবছেনো কোরবানিত এবার গরুর দাম খুব হইবে। কিন্তুক হইচে উল্টাটা। গত ২-৩ মাসে গরুর খাবারের (কৃত্রিম খাবার) দাম বাড়ছে তিন গুণ। সেই খাবার খিলিয়া গরু পুষি বেচেয়া লচ হইচে। কনতো কেষক কী করি খাইবে? যাইবে কোনটে? কেমন করিয়া বাঁচপে!’

তারাগঞ্জ হাটের ইজারাদার স্বপন চৌধুরী বলেন, ‘এবারে কোরবানির হাটে অতীতের তুলনায় সবচেয়ে কম পশু কেনাবেচা হয়েছে। এক সপ্তাহে তিনটি হাট পেয়েছি পশু বিক্রির। সর্বশেষ হাট ছিল গত শুক্রবার। যেখানে পশু বিক্রির লক্ষ্য ছিল ৫০০টি, সেখানে ৩০০টিও কেনাবেচা হয়নি। গরুর খামারি ও কৃষকদের পাশাপাশি হাট ইজারা নিয়ে আমরাও ধরা খেয়েছি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন