মৎস্য বিভাগ, জেলে ও ট্রলারমালিক সূত্র জানায়, টানা ৬৫ দিন মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর জেলেরা ইলিশের সন্ধানে সাগরে নেমেছিলেন ৩ আগস্ট থেকে। এ সময় সেন্ট মার্টিন উপকূলে ধরা পড়ছিল বড় বড় ইলিশ। কিন্তু বরিশাল, বরগুনা, পটুয়াখালী, খুলনা, ভোলাসহ দেশের অন্যান্য উপকূলে ইলিশের দেখা মিলছিল না। একটা সময় ওই সব অঞ্চলের ট্রলারগুলো ইলিশ ধরতে সেন্ট মার্টিন উপকূলে চলে আসে। মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত ২১ দিনে সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকেই আহরিত হয়েছে ৪ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ। আহরিত ইলিশের ৯০ শতাংশের ওজন ছিল ১ কেজির বেশি। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের ইলিশও ছিল।

মৎস্য বিভাগের তথ্য, দেশের ১৬টি উপকূলীয় জেলায় প্রায় ৫ লাখের বেশি জেলে ইলিশ আহরণের সঙ্গে যুক্ত। ইলিশ ধরা না পড়ায় বেশির ভাগ জেলে হতাশ। এখন সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকেও ইলিশ উধাও হওয়ায় কক্সবাজারের ৬ হাজার ট্রলারের অন্তত ১ লাখ ২২ হাজার জেলে এখন দুশ্চিন্তায়।

সেন্ট মার্টিন থেকে হঠাৎ ইলিশ উধাও হওয়ার কারণ জানতে চাইলে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ৪ আগস্ট থেকে সেন্ট মার্টিন উপকূলে বিপুল পরিমাণ ইলিশ ধরা পড়ে। তখন সেন্ট মার্টিনের অল্প পরিমাণ জলসীমানায় ইলিশ ধরছিল ছয়-সাত হাজার ট্রলার। এক জায়গা থেকে বিপুল পরিমাণ ইলিশ আহরণ ও অতিরিক্ত ট্রলারের দৌড়ঝাঁপের কারণে বিরক্ত হয়ে ইলিশ সেন্ট মার্টিন উপকূল ত্যাগ করে পশ্চিম দিকের গভীর সাগরের দিকে চলে যেতে পারে।

এস এম খালেকুজ্জামান আরও বলেন, আগামী অক্টোবর মাসে এই ইলিশ পুনরায় উপকূলে ঝাঁক বেঁধে ফিরে আসবে, নদীর মোহনায় গিয়ে ডিম পাড়বে। ইলিশের জীবনচক্র এমনই।

সংকটে চড়া দামে ইলিশ বিক্রি

গতকাল সোমবার সকালে কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছটা ফিশারি ঘাট গিয়ে দেখা গেছে, গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে ফিরেছে ৪০টির বেশি ট্রলার। ট্রলারে আছে ইলিশ, লাক্ষ্যা, কোরাল, গুইজ্যা, চাপা, মাইট্যাসহ নানা সামুদ্রিক মাছ। ট্রলারের মাছ প্রথমে ডিঙিনৌকায় খালাস করা হয়। তারপর সেই মাছ আনা হয় ফিশারি ঘাট পাইকারি মাছ বিক্রির বাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে। এখান থেকে ব্যবসায়ীরা ইলিশ কিনে ট্রাকবোঝাই করে সরবরাহ করেন চট্টগ্রাম, ঢাকা, বগুড়া, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

ফিশারি ঘাটের বাজারে বিক্রির জন্য ৩৫০টি ইলিশ নিয়ে আসেন এফবি সালমান নামের একটি ট্রলারের জেলেরা। ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ গ্রাম ওজনের প্রতিটি ইলিশ ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়। ট্রলারের জেলে মনির উল্লাহ (৫৫) বলেন, ৮ দিন আগে সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকে তাঁরা ৩ হাজার ইলিশ ধরে পেয়েছিলেন ২৭ লাখ টাকা। কিন্তু এখন সেন্ট মার্টিন উপকূলে ইলিশের দেখা মিলছে না। ৫-৬ দিন সাগরে জাল ফেলে মাত্র ৩৫০টি ইলিশ পাওয়া গেছে।

এফবি ফয়সাল নামের আরেকটি ট্রলার ১ হাজার ১০০টি ইলিশ বিক্রি করে পেয়েছিল ১০ লাখ টাকা। ট্রলারের জেলে গিয়াস উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত ট্রলারের বিচরণ ও বিরক্তির কারণে সম্ভবত দল বেঁধে ইলিশ গভীর সাগরের দিকে চলে গেছে। ইলিশ এমনিতে গভীর জলের মাছ। কিন্তু ডিম পাড়ার সময় পুনরায় সেন্ট মার্টিন ও টেকনাফ উপকূলে ফিরে আসতে পারে।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান নুর আহমদ বলেন, গত ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত ৬৫ দিন সাগরে মাছ আহরণ বন্ধ ছিল। এ কারণে ইলিশের প্রজনন ও আকার বেড়েছে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে ১০-১২ কিলোমিটার গিয়ে জেলেরা জাল ফেলে ধরে আনেন হাজার হাজার ইলিশ। ওই সময় সেন্ট মার্টিনের ৩০০ ট্রলারের জেলেরাও বিপুল ইলিশ ধরে এনেছিলেন। কিন্তু চার-পাঁচ দিন ধরে জেলেরা ইলিশের সন্ধান পাচ্ছেন না। ইলিশ ধরতে বড় কিছু ট্রলার ৮০-১০০ কিলোমিটার দূরে গভীর সাগরে ছুটছে।

কক্সবাজার শহরের ফিশারি ঘাটের মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় ইলিশ সরবরাহ করেন কক্সবাজার মৎস্য ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির সদস্যরা। সমিতির সদস্যসংখ্যা প্রায় দেড় হাজার।

সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, সোমবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই ফিশারি ঘাট থেকে ইলিশ বোঝাই করে একটি ট্রাক ঢাকায় গেছে। ট্রাকে ইলিশ দেওয়া হয়েছে ১২ হাজার। অথচ ৪ দিন আগেও এই ঘাট থেকে দৈনিক ৭-৮টি ট্রাকে ৬০-৭০ হাজার ইলিশ সরবরাহ করা হয়েছিল। হঠাৎ করে ইলিশ আহরণ কমে আসায় বাজারে দামও বেড়েছে কেজিপ্রতি ১০০-২৫০ টাকা। ইলিশের দাম ওঠানামা করে ঢাকার বাজার পরিস্থিতির ওপর।

ফিশারি ঘাটে পাইকারিতে ৮০০ থেকে ১ হাজার গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজিপ্রতি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২৫০, ১ হাজার থেকে ২ হাজার গ্রাম বা তার বেশি ওজনের ইলিশ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০, ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ৬০০ থেকে ৮৫০ এবং ৫০০ গ্রামের কম ওজনের ইলিশ ৩৫০ থেকে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মৎস্য বিভাগের তথ্যমতে, গত বছর জেলায় ইলিশ আহরিত হয়েছিল ১৫ হাজার ২৫৬ মেট্রিক টন। এবার ইলিশ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৭ হাজার মেট্রিক টন। জেলায় ৪ আগস্ট থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫০০ মেট্রিক টন সামুদ্রিক মাছ আহরিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০০ মেট্রিক টন ছিল ইলিশ। ২৫ আগস্ট পর্যন্ত ২১ দিনে মাছ আহরিত হয়েছে প্রায় ১১ হাজার মেট্রিক টন, এর মধ্যে ইলিশ ২ হাজার ১০০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ ইলিশের ওজন ছিল ৯০০ গ্রাম থেকে ১ হাজার ২০০ গ্রাম।
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, ইলিশ আহরণ ক্রমান্বয়ে কমে এলেও অন্যান্য মাছের আহরণ বেড়েছে কয়েক গুণ। সে ক্ষেত্রে জেলায় মাছ আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন