বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঈদের সকালে ভ্যানে করে শসা, লেবু ও বিভিন্ন সবজি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন ইয়াছিন। বেচাবিক্রি হলেই কিছু আয় হবে। আর সেই টাকায় পরিবারের জন্য কিছু কিনে বাড়ি ফিরবেন তিনি। বললেন, ‘অভাবের সংসারে শিশুবয়স থেকেই পরিবহনশ্রমিক হিসেবে সংগ্রাম শুরু করি। চালকের সহকারীর কাজ করতে গিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা শিখি। ছয় সদস্যের সংসার চলত আমার আয়ে। গত বছর দুই মাস লকডাউনে চলতে গিয়ে অনেক ঋণ হয়েছে। ঋণের বোঝা নিয়ে চলছি। পরিবহনে আয় কমে এসেছে। দিশেহারা হয়ে ১৮ বছরের কাজটাই ছেড়ে দিলাম। এখন সংসারের স্টিয়ারিং ধরতে সবজি বিক্রেতা হয়েছি। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই বেঁচে আছি। যা আয়, তা দিয়ে সংসারে বাড়তি কোনো আনন্দ-উৎসব করতে পারি না।’

default-image

শরীয়তপুর জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতি সূত্র জানায়, শরীয়তপুর জেলা ও বাইরের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে ১০টি রুটে ১৯০টি বাস চলাচল করে। ওই বাসগুলোয় দেড় হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। করোনার কারণে গত বছর দুই মাস, এ বছর দুই দফায় ২১ দিন গণপরিবহন চলাচল বন্ধ ছিল। এ ছাড়া করোনার কারণে শরীয়তপুরের বিভিন্ন রুটে চলাচল করা বাসে যাত্রী কমে গেছে। এ কারণে পাঁচটি রুটে বর্তমানে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। ওই শ্রমিকদের অনেকে পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশায় যোগ দিয়েছেন। অনেকে বেকার আছেন, অনেকে অল্প বেতনে পরিবহনেই আছেন।

সদর উপজেলার কাশিপুর গ্রামের সোহেল মোল্লা (৩২)। ১৫ বছর পরিবহনশ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন। চালক হিসেবে আট বছর বিভিন্ন রুটে বাস চালিয়েছেন। করোনার কারণে পরিবহনে আয় কমে যাওয়ায় তিন মাস আগে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। আট সদস্যের সংসার চালাতে এখন গ্রামে রিকশাভ্যান চালাচ্ছেন।

গত ১৭ মাসে লোকসানের বোঝা টানতে গিয়ে মালিকেরা নিঃস্ব হয়েছেন। আর শ্রমিকেরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন। পরিস্থিতির কারণে কেউ কারও দিকে ফিরে তাকাতে পারেননি।
পরিমল দত্ত, বাসের মালিক ও শরীয়তপুর বাস মালিক সমিতির ব্যবস্থাপক

সোহেল মোল্লা বলেন, ‘জীবনের অর্ধেক সময় কাটিয়েছি পরিবহন সেক্টরে। ছেড়ে আসার সময় কষ্ট হয়েছে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের কষ্ট সইতে না পেরে বাসের স্টিয়ারিং ছেড়ে ভ্যানের প্যাডেল বেছে নিয়েছি। দুই বেলা দুই মুঠো খাবার জোগাড় করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে বিশেষ দিনে বাড়তি কোনো আয়োজন ও উৎসব করার টাকা কোথায় পাব?’

বাসের মালিক ও মালিক সমিতির ব্যবস্থাপক পরিমল দত্ত বলেন, শরীয়তপুরের পরিবহন ব্যবসাটা সংকটের মধ্যে পড়েছে। গত ১৭ মাসে লোকসানের বোঝা টানতে গিয়ে মালিকেরা নিঃস্ব হয়েছেন। আর শ্রমিকেরা কাজ হারিয়ে বেকার হয়েছেন। পরিস্থিতির কারণে কেউ কারও দিকে ফিরে তাকাতে পারেননি।

গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীর বাসিন্দা দীপু শেখ (৫০) শরীয়তপুরের একটি বাসের শ্রমিক। হাতে টাকা না থাকায় ঈদে সন্তানদের কাছে যেতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আগে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দিনে আয় হতো। তা দিয়ে ভালোভাবে চলছিলাম। আর এখন ঠিকমতো বাস চলে না। বাস চললেও যাত্রী পাওয়া যায় না। নিজের খাবারের টাকাই জোগাড় করতে পারি না। পরিবারে সদস্যদের কীভাবে টাকা দেব? ঈদে পরিবারের জন্য কিছু করতে পারিনি। সন্তানেরা ফোন করে। ভালো আছি জানিয়ে ফোন বন্ধ করে রেখেছি। আর বাসে বসে চোখের পানি ফেলছি।’

default-image

শরীয়তপুর আন্তজেলা বাস ও মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফারুক চৌকিদার বলেন, ‘শ্রমিকদের অনেক কষ্টে দিন কাটছে। করোনা পরিস্থিতি আমাদের রাস্তায় নামিয়েছে। গত ১৭ মাসে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে দুই দফায় পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে ৮০০ শ্রমিককে। আর বাকি শ্রমিকের ভাগ্যে কিছু জোটেনি। বাধ্য হয়ে তাঁরা অন্য পেশায় ছুটছেন।’

শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. পারভেজ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, করোনার কারণে শ্রমজীবী মানুষ সমস্যায় পড়েছেন। এটা বিবেচনা করে সরকার নানা ধরনের সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। বিভিন্ন সময় খাদ্য ও অর্থসহায়তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও দেওয়া হবে। এ ছাড়া কেউ সমস্যায় থাকলে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে খাদ্যসহায়তা পৌঁছে দেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন