জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, খোয়াই নদের বালুমহাল ইজারার শর্তাবলিতে বলা হয়েছিল, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের ধারা অনুসারে পাম্প বা ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ বালু তোলা যাবে না। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও পরিবেশদূষণমুক্ত রাখতে হবে। নদের ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশ, মৎস্য, জলজ প্রাণী বা উদ্ভিদ বিনষ্ট হলে বা হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বালু তোলা যাবে না।

নদের চৌধুরী বাজার পয়েন্ট থেকে শায়েস্তাগঞ্জ সেতু পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার এলাকা ঘুরে দেখা গেল, নদে শত শত পাম্প শ্যালো মেশিন বসানো হয়েছে। দিন-রাত নিষিদ্ধ ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। ইজারাদাররা বালু তোলার কোনো শর্তই মানছেন না। বালু তোলায় নদের প্রতিরক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে ক্ষতি হয়েছে।

রুবেল মিয়া নামের শ্যালো মেশিনের এক চালক বলেন, এগুলো দিয়ে নদের গভীর থেকে বালু তোলা হচ্ছে। এসব মেশিনে বালু বেশি ওঠে। যে কারণে এ মেশিনের ব্যবহার হয়ে থাকে।

খোয়াই নদের গরুর বাজার, চৌধুরী বাজার, নোয়াবাদ, পূর্ব শ্যামলী, ইনাতাবাদ, মাচুলিয়া, মাচুলিয়া সেতু এলাকা, তেঘরিয়া, ভাদৈসহ অর্ধশত স্থানে দেখা গেল, নদের বুকে বালুর ট্রাক্টরের লম্বা সারি। কোনোটি বালু নিয়ে যাচ্ছে। কোনোটি আসছে। কোনোটি দাঁড়িয়ে আছে।

ট্রাক্টরচালক ও শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নদ থেকে প্রতিদিন দুই-তিন শ ট্রাক্টর বালু বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিটি ট্রাক্টরে বালু ওঠে ১০০ থেকে ১২০ ঘনফুট। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে আরও দুই শতাধিক বালু পরিবহন করা হয় ছোট ছোট ট্রলি ও ঠেলাগাড়ির মাধ্যমে। সব মিলে প্রতিদিন খোয়াই থেকে প্রায় ১ লাখ ঘনফুট বালু ওঠে।

সরেজমিনে দেখা গেল, বাঁধের ওপর দিয়ে বালুবাহী ট্রাক্টরসহ অন্যান্য পরিবহন চলাচল করায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে নোয়াবাদ, ইনাতবাদ, মাছুলিয়া, মাছুলিয়া সেতু এলাকা, পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পেছনের অংশ, ভাদৈ ও তেঘরিয়া এলাকায়। এসব স্থানের প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন ও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।

শায়েস্তানগর খোয়াই বাঁধ এলাকার বাসিন্দা মনোয়ারা বেগম বলেন, ভোর থেকে শুরু হয় বাঁধের ওপর বালুবাহী ট্রাক্টরের চলাচল। নদতীরবর্তী জায়গা থেকে বালু তোলায় তাঁদের বাড়ির পাশে নদের বাঁধে বড় বড় ভাঙন দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, ১৪২৮ বঙ্গাব্দের জন্য খোয়াই নদের বালুমহাল ইজারা পান মকসুদ আলী নামের এক ব্যক্তি। তিনি ১ কোটি ২০ লাখ ৬০ হাজার টাকায় এটি ইজারা নেন।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মকসুদ আলী বালুমহালটি ইজারা নিলেও এর পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা জড়িত। ইজরাদার নিজে বালু উত্তোলন না করে তিনি উপ–ইজারা দিয়েছেন শতাধিক ব্যক্তিকে। তাঁরাই স্থানে স্থানে বালু তোলার মেশিন বসিয়ে যেনতেনভাবে তুলছেন বালু। বালু ও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, খোয়াই নদের বালুমহালে দিনে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার বালু বিক্রি হয়।

ইজারাদার মকসুদ আলী স্বীকার করেছেন, বালুমহালটি তাঁর নামে ইজারা নিলেও স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি তাঁর এ ব্যবসার সহ-অংশীদার। তবে তাঁদের নাম প্রকাশ করতে তিনি রাজি হননি।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, তাঁরা সব সময়ই প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে আসছেন নদটি ইজারা না দেওয়ার জন্য। তারপরও তাঁরা ইজারা দিচ্ছেন। এ নদ ইজারা দিয়ে সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব পাচ্ছে, তার ১০ গুণ ক্ষতি হচ্ছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহানেওয়াজ তালুকদার বলেন, ‘আমরা বিষয়টি সব সময়ই জেলা প্রশাসনকে জানিয়ে আসছি। একমাত্র ভ্রাম্যমাণ আদালতই পারেন নদের প্রতিরক্ষা বাঁধটি রক্ষা করতে।’

জেলা প্রশাসক ও জেলা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ইশরাত জাহান প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম মেনে বালু তুলতে ইজারাদারদের সব সময় তাগিদ দিয়ে থাকেন। ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা যাবে না। ইজারাদাররা কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন