শহীদ বুদ্ধিজীবী মুসলিম মিয়ার কোনো স্মৃতিচিহ্নও নেই

গোপালপুরের ঝাওয়াইল রাজকুমারী সুরেন্দ্রবালা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী মুসলিম উদ্দিন মিয়া।
প্রথম আলো

শহীদ বুদ্ধিজীবী মুসলিম উদ্দিন মিয়ার কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই তাঁর নিজ এলাকা টাঙ্গাইলের গোপালপুরে। দেশ স্বাধীন করার জন্য জীবন উৎসর্গকারী এই শিক্ষকের আত্মত্যাগের কথা জানে না নতুন প্রজন্ম। তাঁর স্মৃতি রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন।
গোপালপুরের ঝাওয়াইল রাজকুমারী সুরেন্দ্রবালা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন মুসলিম উদ্দিন মিয়া। ১৯২০ সালের দিকে তাঁর জন্ম একই উপজেলার কড়িআটা গ্রামে। লেখাপড়া শেষে তিনি ঝাওয়াইল রাজকুমারী সুরেন্দ্রবালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সে সূত্রেই তিনি ঝাওয়াইল গ্রামের স্থায়ী বসতি করেন। তাঁর স্ত্রী খোদেজা মুসলিম একই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। মুসলিম উদ্দিনের হাতেই সুরেন্দ্রবালা প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।

স্থানীয় লোকজন জানান, শিক্ষকতার পাশাপাশি মুসলিম উদ্দিন স্বাধীনতাসংগ্রামে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। ’৭০-এর নির্বাচনে গোপালপুর আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হাতেম আলী তালুকদারের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারকাজে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এলাকায় অবস্থান করে তিনি স্থানীয় যুবকদের যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের নানাভাবে সাহায্য–সহযোগিতা করতেন। এ বিষয়টি ভালোভাবে নেয়নি স্থানীয় রাজাকার-আলবদররা।
ঝাওয়াইল মহারানী হেমন্ত কুমারী উচ্চবিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক পীযূষ কান্তি সাহা জানান, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নভেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিদ্যালয়ের কাজে টাঙ্গাইল শহরে যান মুসলিম উদ্দিন। এ খবর জেনে যায় গোপালপুরের রাজাকার-আলবদররা। কাজ শেষে মুসলিম উদ্দিন বাড়ি ফেরার জন্য টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে ওঠেন। এ সময় গোপালপুরের রাজাকার বাহিনীর নেতা কহিনুর মিয়া তাঁকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরিয়ে দেন। তারপর তিনি আর ফিরে আসেননি। তবে বিভিন্ন সূত্রে স্বজনেরা পরে জানতে পারেন, তাঁকে প্রথমে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউস এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা তাদের নির্যাতনকেন্দ্রে আটকে রাখে। পরে তাঁকে জেলা সদর পানির ট্যাংকের পাশের বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়।
ওই সময় মুসলিম উদ্দিন স্ত্রী খোদেজা মুসলিম এবং বেদেনা ও লুসি নামের দুই মেয়ে রেখে যান। প্রায় ২০ বছর আগে খোদেজা মুসলিম মারা গেছেন। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন বড় মেয়ে বেদেনা। ছোট মেয়ে লুসি ঢাকায় বসবাস করেন।
রোববার দুপুরে ঝাওয়াইল গিয়ে দেখা যায়, কোথাও কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই এই শহীদ বুদ্ধিজীবীর। এমনকি তিনি যে স্কুলের শিক্ষক ছিলেন, সেখানেও তাঁর কোনো স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়নি। ঝাওয়াইল বাজারে কথা হয় হাবিবুর রহমান ও আশিকুর রহমানসহ কয়েকজন যুবকের সঙ্গে। তাঁদের কেউ মুসলিম উদ্দিনের নামও জানেন না।

ঝাওয়াইল বাজারের পাশে মুসলিম উদ্দিনের বাড়িতে এখন তাঁর বড় মেয়ের ঘরের নাতনি পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। ওই বাড়িতেই কথা হয় নাতনি–জামাই লুৎফর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, তাঁদের কাছে মুসলিম উদ্দিনের কোনো ছবি নেই। কয়েক বছর আগে শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে মুসলিম উদ্দিনের ছবি দিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছিল। সেটিও তাঁদের কাছে নেই। তবে ঢাকায় মুসলিম উদ্দিনের ছোট মেয়ের কাছে এগুলো থাকতে পারে।
স্থানীয় সাংসদ তানভীর হাসান ওরফে ছোট মনির বলেন, আরও আগেই শহীদ বুদ্ধিজীবী মুসলিম উদ্দিনের স্মৃতি রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। ভবিষ্যতে এই বুদ্ধিজীবীসহ এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদদের স্মৃতি রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।