কিংবদ‌ন্তি এক বাউল

শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী কাল

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রায় এক যুগ আগের ঘটনা। এখনো কত সজীব আর প্রাণবন্ত সেই স্মৃতি। আমরা ভেসে চলছিলাম শেষ বর্ষার যৌবন হারানো বরাম হাওর দিয়ে। কাঠফাটা রোদ আমাদের চোখ ধাঁধাচ্ছিল। কিছু গাঙচিল, সারস, চড়ুই আর কাক উড়ছিল আমাদের মাথার ওপর। বরাম হাওরের স্বচ্ছ জলে ভাসমান সবুজ জলজ উদ্ভিদগুলো সামান্য বাতাসে দুলছিল। আরও দূরে হিজল-করচের গাছগুলো যেন আমাদের প্রতীক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।

আমরা জনাত্রিশেক বেদনাবিধুর মানুষ ‘ময়ূরপঙ্খি’ নৌকার ছইয়ের ওপর বসে ছিলাম। আমাদের সামনে-পেছনে নৌকাভর্তি কয়েক শ মানুষ। সবার দৃষ্টি আমাদের নৌকার দিকে। ততক্ষণে বাউল রণেশ ঠাকুর করুণ গলায় কেঁদে কেঁদে গান ধরেন, ‘কেন পিরিতি বাড়াইলায় রে বন্ধু/ছেড়ে যাইবায় যদি’। রণেশের দরদি গলার গান শুনে নৌকাভর্তি মানুষের আবেগ যেন উছলে ওঠে। সবার চোখ ছলছল করছে। এবার গানে টান দেন বাউল আবদুর রহমান।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দুই বাউলের দরদি গলার গান হাওরের তপ্ত বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এত এত নৌকা, এত এত মানুষ, বরামের হাওরে এত এত জল। কিন্তু কোনো মানুষের মুখে শব্দ নেই, বরাম হাওরের পানিতে নেই কোনো আফালের (হাওরের ঢেউ) গর্জন। এ এক অন্য রকম দৃশ্য। ধীরে ধীরে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। একসময় উজানধল গ্রামে আমাদের নৌকা থামে। আগে থেকেই সেখানে অবস্থানরত হাজারো মানুষ এবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে আমাদের নৌকায়। কারণ, এ নৌকার ছইয়েই যে ‘আতর-গোলাপ চুয়া-চন্দন’ গায়ে মেখে চুপচাপ শুয়ে আছেন প্রিয় বাউল শাহ আবদুল করিম।

তিন অনুচ্ছেদের এ কাহিনি আমি লিখেছি শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান বইয়ের প্রাক্-কথায়। ২০০৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকালে কিংবদ‌ন্তি সাধক শাহ আবদুল করিম সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এর পরদিন মরদেহ নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উজানধল গ্রামে যাওয়ার কথাই বলছিলাম এতক্ষণ। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রথমা প্রকাশন বইটি প্রকাশ করেছিল। এখন বাজারে বইটির চতুর্থ মুদ্রণ চলছে।

বাউলশিল্পী শাহ আবদুল করিম ২০০১ সালে একুশে পদক অর্জন করেন। তবে গ্রামীণ পরিমণ্ডলে বসবাসের কারণে শহুরে মানুষের চোখের আড়ালেই ছিলেন তিনি। প্রথম আলো এই মনীষীকে নিয়ে নানা সময়ে তাদের ফিচার পাতা ‘আনন্দ’ ও ‘ছুটির দিন’ থেকে শুরু করে মূল পত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন-সংবাদ প্রকাশ করে। ২০০৪ সালে তাঁর হাতে তুলে দেয় ‘মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা’ পুরস্কার। ‘রাখালবালক’ হিসেবে শৈশবে যে করিমের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল, সেই তিনি এখন এক কিংবদ‌ন্তির নাম। শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুর কয়েক বছর পর একদিন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে তাঁর ক‌ক্ষে বসে নানা বিষয়ে আলাপ হচ্ছিল। প্রকাশনা সংস্থা প্রথমা প্রকাশন নিয়ে সম্পাদক তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা বলছিলেন। তখনই তিনি শাহ আবদুল করিমের জীবন, দর্শন ও কর্ম নিয়ে আমাকে পূর্ণাঙ্গ একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতের পরামর্শ দেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো সম্পাদকের প্রস্তাব পাওয়ার পর মনে সামান্য দ্বিধা ছিল। এটি তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে বিনয়ের সঙ্গে জানাই এবং এ–ও বলি, এর আগে করিমকে নিয়ে আমার একাধিক গ্রন্থ রচনার বিষয়টি। তখন মতিউর রহমান করিম-সম্পর্কিত যেসব কথা আগে কখনো বলা হয়নি, সেসবের পাশাপাশি বলা কথাগুলো নিয়ে একটি বই লেখার অনুপ্রেরণা দেন। তাঁর উৎসাহে মূলত শাহ আবদুল করিম: জীবন ও গান বইটি লিখি। আমার দীর্ঘদিনের চেনাজানা শাহ আবদুল করিমের সমগ্র জীবন ও নির্বাচিত কিছু গান এভাবে এক মলাটভুক্ত হওয়ার পুরো কৃতিত্বই তাঁর। বইটি রচনায় করিম-রচিত আত্মস্মৃতি, তাঁর গান, সাক্ষাৎকার এবং তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতা কাজে লাগিয়েছি।

শাহ আবদুল করিমকে নিয়ে এক স্মৃতির কথা লিখে আপাতত শেষ করি। সিলেটে এক অনুষ্ঠানে করিমকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানের শেষ দিকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, এবার বাউলের হাতে তুলে দেওয়া হবে সোয়া তিন লাখ টাকার চেক। শাহ আবদুল করিম কানে ভুল শুনে পাশে বসা একমাত্র ছেলে শাহ নূরজালাল ওরফে বাবুলকে বলেন, ‘সোয়া তিন হাজার টাকা! এ তো অনেক টাকা! এত টাকা আমি নেব না।’ তখন তাঁকে জানানো হয়, সোয়া তিন হাজার নয়, সোয়া তিন লাখ টাকা। শাহ আবদুল করিম এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘সোয়া তিন লাখ! এত টাকা দিয়ে আমার কী কাজ! মানুষ ভালোবাসে, এইটাই বড়। এই টাকা আমার দরকার নাই। এই বাবুল চল, বাড়ি যাই...।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন