default-image

‘আমার বাবা একজন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তিনি পেশাটাকে চাকরি হিসেবে নেননি। নিজের জমিদারি ফেলে তিনি পেশাটাকে গ্রহণ করেছিলেন মানুষ গড়ার একজন কারিগর হিসেবে। কিন্তু সমাজ তাঁকে মূল্যায়ন করেনি। তবুও আমি গর্ব করি একজন আদর্শিক শিক্ষকের মেয়ে হিসেবে। কারণ, এই শিক্ষকেরাই হচ্ছেন দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের মূল হাতিয়ার, নিঃস্বার্থ কারিগর।’

‘আইপিডিসি-প্রথম আলো প্রিয় শিক্ষক সম্মাননা-২০২০’ উপলক্ষে অনলাইন সুধী সংযোগ কক্সবাজার পর্বের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন উম্মে সাদিয়া হোসেন সিকদার। কক্সবাজারের উপকূলীয় উপজেলা পেকুয়া থেকে তিনি আলোচনায় যুক্ত হন। তিনি কক্সবাজার সরকারি কলেজের সম্মান চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সুধী সংযোগ অনুষ্ঠিত হয়। আজ মঙ্গলবার বিকেল পাঁচটায় শুরু হওয়া এই সুধী সংযোগে অংশ নেন কক্সবাজারের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিল্পপতি-ব্যবসায়ী, আইনজীবী, কবি-সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা।

প্রথম আলোর কক্সবাজারের নিজস্ব প্রতিবেদক আব্দুল কুদ্দুসের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর যুব কার্যক্রম ও ইভেন্টস বিভাগের প্রধান মুনির হাসান। তিনি বলেন, ‘শৈশবের শিক্ষকদের সম্মান জানানোর জন্যই আমাদের এই আয়োজন। শুভেচ্ছা বক্তব্যে আইপিডিসি ফাইন্যান্স লিমিটেড চট্টগ্রাম ব্রাঞ্চের ব্যবস্থাপক অনির্বাণ সরকার বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা প্রিয় শিক্ষকদের সম্মান জানাতে অংশীদার হয়েছি।’

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে চকরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ কে এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘শিক্ষকের জ্ঞান নিয়ে আমরা জগতকে দেখি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষকের মর্যাদা সবার আগে, আমাদের দেশে এই পেশা এখন কতটুকু মর্যাদায় আছে, সেটা আমরা সবাই জানি। মেধাবী শিক্ষার্থীরা এখন শিক্ষকতা পেশায় আসতে চান না। অনেকে অন্যান্য চাকরিতে প্রতিযোগিতায় ঠিকতে না পেরে এ পেশাকে বেছে নিচ্ছে। এতে শিক্ষার মান তলানিতে যাচ্ছে।’

কক্সবাজার সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ উল্লাহ বলেন, কক্সবাজারে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ফলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবিমুখ হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা উচ্চ বেতনে রোহিঙ্গা শিবিরে চাকরি করছে। ফলে তাঁরা ভবিষ্যৎ জীবনের লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত।

মেধাবীরা শিক্ষকতায় না এলে যোগ্য জাতি গড়ে উঠবে না। তাঁদের পর্যাপ্ত জোগান দিতে হবে। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় আমাদের বাড়তি রোজগারের চিন্তা করতে হয়।
মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক, কক্সবাজার জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, ‘সম্মাননা অর্জনের বিষয়। এটি এমনিতে আসে না। শিক্ষকের জীবনকে আমি দুই ভাগে দেখি। একটি স্যাটিসফায়েড লাইফ, আরেকটি সাকসেসফুল লাইফ। আমি কিন্তু শিক্ষকের ক্ষেত্রে সাকসেসফুল লাইফ চাই না। কোনো শিক্ষক স্যাটিসফায়েড লাইফে থাকলে তাঁর হাহুতাশ থাকবে না। তবে এটা সত্য যে শিক্ষক ছাড়া আমাদের গতি নেই। শিক্ষকদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিহার করতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কারণে শিক্ষকেরা সমাজে খাটো হচ্ছেন।’

কক্সবাজার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিন বলেন, ‘আমি মনে করি, শিক্ষকেরা সভ্যতার অভিভাবক। তবে এটাও উল্লেখ করতে হয়, আমরা শিক্ষকেরা প্রযুক্তির জ্ঞান কতটুকু অর্জন করতে পেরেছি! শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কি আমরা দিতে পারছি? এ জন্য প্রযুক্তিতে এগিয়ে যেতে হবে শিক্ষকদের।’

কক্সবাজার জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নজিবুল ইসলাম বলেন, ‘মেধাবীরা শিক্ষকতায় না এলে যোগ্য জাতি গড়ে উঠবে না। তাঁদের পর্যাপ্ত জোগান দিতে হবে। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকায় আমাদের বাড়তি রোজগারের চিন্তা করতে হয়। এতে ভালো প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয় না।’

জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আয়াছুর রহমান বলেন, শিক্ষকেরা মানুষ গড়ার কারিগর। শিক্ষকেরা অনুকরণীয়। তাঁরা সারা জীবন আলো দিয়ে যান। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, একজন প্রাথমিকের শিক্ষক কোনোমতে খেয়ে–পরে বেঁচে আছেন। তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে আরও বেশি পদক্ষেপ দরকার।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষককে দেওয়া হবে এ সম্মাননা। একজন মনোনয়নকারী সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে মনোনীত করতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে সংযুক্ত হয়ে আরও বক্তব্য দেন কক্সবাজার জেলা পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান আসমাউল হুসনা, কক্সবাজার সরকারি কলেজের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মফিদুল আলম, কক্সবাজার সিটি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জেবুন্নেছা, কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রামমোহন সেন, স্বেচ্ছাসেবী বেসরকারি সংগঠন মার্কি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান হাসনা হুরাইন চৌধুরী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, কক্সবাজার বিতর্ক ক্লাবের সভাপতি শামীম আকতার, কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, সমাজকর্মী মাসুমা আক্তার, টিআইবি কক্সবাজার ইয়েস ফ্রেন্ডস গ্রুপের সহদলনেতা আবদুল্লাহ আল মামুন, কক্সবাজার ব্লাড ডোনার্স সোসাইটির এডমিন আশরাফুল হাসান, টেকনাফ ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মারুফা জান্নাত, রামু বিট পুলিশিং ফোরামের সাধারণ সম্পাদক হাফেজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখ।

বক্তারা আইপিডিসি ও প্রথম আলো শিক্ষকদের সম্মাননার উদ্যোগকে প্রশংসনীয় উল্লেখ করে এ কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। অনুষ্ঠানে একাধিক ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়। অনুষ্ঠানের আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন প্রথম আলো কক্সবাজারের বন্ধুসভার সদস্যরা।

আয়োজকেরা জানান, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষককে দেওয়া হবে এ সম্মাননা। একজন মনোনয়নকারী সর্বোচ্চ তিনজন শিক্ষককে মনোনীত করতে পারবেন। মনোনয়নকারীর বয়স হতে হবে কমপক্ষে ১৮ বছর। অনলাইনে নির্দিষ্ট ফরমে আবেদন করা যাবে (www.priyoshikkhok.com) এ ওয়েব ঠিকানায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0