বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কানুপুর উচ্চবিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আক্কেলপুর পৌর শহরের পুরোনো থানা এলাকার বাসিন্দা রইচ উদ্দিন ওরফে টিপু ১৯৯৬ সালে উপজেলার কানুপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হন। দীর্ঘদিন অবিবাহিত ছিলেন তিনি। পরে ২০০৮ সালে বিয়ে করেন। তাঁর দুই মেয়ে রয়েছে, একজনের বয়স এখন আট বছর, আরেকজনের দুই বছর। দীর্ঘ ২২ বছর শিক্ষকতা করার পর ২০১৮ সালে যখন অবসরে যান তিনি, তখন তাঁর কোনো সহায়-সম্পদ ছিল না। অবসরের পর বেতন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটে পড়েন। বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে একটি দোকানে চাকরি নেন। অতিমারি করোনায় লকডাউন শুরু হলে দোকানটি বন্ধ হয়ে যায়। তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকা ছেড়ে জয়পুরহাট শহরে চলে আসেন। তিনি জয়পুরহাট শহরের একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় বয়ের কাজ নেন। সেখানে তিনি প্রায় সাত মাস কাজ করেন। সেখানে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা ও দুপুরের খাবার পেতেন তিনি।

হঠাৎ করে রইস উদ্দিনের একজন পরিচিত ব্যক্তি গত বছর ওই রেস্তোরাঁয় গিয়ে তাঁকে থালা পরিষ্কার করতে দেখেন। তিনি সেই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন।

করোনাকালে জয়পুরহাট শহরের একটি চায়নিজ রেস্তোরাঁয় বয়ের কাজ নেন রইস উদ্দিন। সেখানে তিনি প্রায় সাত মাস কাজ করেন। হঠাৎ করে রএকজন পরিচিত ব্যক্তি গত বছর ওই রেস্তোরাঁয় গিয়ে তাঁকে থালা পরিষ্কার করতে দেখে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা জানান, রইস উদ্দিন চাকরিরত অবস্থায় ২০১৪ সালে একটি দুর্ঘটনার শিকার হন। ওই দুর্ঘটনায় তাঁর বাঁ পা ভেঙে যায়। তিনি চিকিৎসা করাতে গিয়ে চার শতক বসতবাড়ি ও দুই বিঘা ফসলি জমি বিক্রি করে দিয়েছিলেন।

এরপর আর কোনো স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছিল না তাঁর। রেস্তোরাঁয় তাঁর থালা পরিষ্কার করার ছবি প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেখে সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা একটি সহায়তা কমিটি গঠন করেন। তাঁরা নিজেরা ও স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। এরপর তাঁরা প্রিয় শিক্ষককে রেস্তোরাঁ থেকে এনে কানুপুর গ্রামের একটি বাড়ি ভাড়া করে সেখানে রাখেন। বাড়িভাড়া ও প্রতি মাসে চলার জন্য টাকাও দিচ্ছিলেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা প্রিয় শিক্ষকের জন্য বিদ্যালয়ের পেছনে মুনইল গ্রামে তিন শতক জমি কেনেন। ওই জায়গায় তাঁরা স্যারের জন্য আধা পাকা একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। সেই বাড়িটির নাম রাখা হয় ‘প্রতিশ্রুতি ভিলা’। আজ বিকেল সাড়ে চারটায় আনুষ্ঠানিকভাবে সেই বাড়িটি হস্তান্তর করা হয়।

অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রইচ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার সামান্য জমি ছিল। দুর্ঘটনার পর চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমি বিক্রি করেছি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর বেতন বন্ধ হয়ে যায়। সংসার চালাতে গিয়ে ঢাকায় একটি দোকানে ও জয়পুরহাটে চায়নিজ রেস্টুরেন্টে কাজ করেছি। আমার দুঃখ-কষ্ট দেখে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসে। আমাকে তারা বাড়ি করে দিয়েছে। এতে আজকে নিজের বাড়িতে থাকতে খুব ভালো লাগছে। আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

রইচ উদ্দিন স্যারের সহায়তায় গঠিত প্রাক্তন শিক্ষার্থী সমিতির আহ্বায়ক হিরো রহমান বলেন, জমি কেনা থেকে বাড়ি করা পর্যন্ত প্রায় সাত লাখ টাকা লেগেছে। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বিদ্যালয় শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও দানশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে এই টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে।

কানুপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রইচ উদ্দিন স্যার এখনো অবসরের টাকা পাননি। তিনি যেন দ্রুত অবসরের টাকা পান, তার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। রইচ উদ্দিন স্যারের দুঃখ–কষ্টের কথা শুনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত অবসরের টাকার ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছে।’

ইউপি চেয়ারম্যান আহসান কবির বলেন, ‘বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা একটি মহৎ কাজ করেছেন। প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা এ রকম মহৎ কাজ অব্যাহত রাখবেন বলে আশা করছি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন