নবান্ন উৎসব উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা।  দিনব্যাপী এ মেলায় আনা সব মাছই ছিল আকারে বড়। আজ মঙ্গলবার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলী গ্রামে
নবান্ন উৎসব উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী মাছের মেলা। দিনব্যাপী এ মেলায় আনা সব মাছই ছিল আকারে বড়। আজ মঙ্গলবার বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলী গ্রামেসোয়েল রানা

রোদমাখা সকালে গ্রামের ইট বিছানো সড়কে দল বেঁধে ছুটছে মানুষ। সবার গন্তব্য নবান্নের মাছের মেলা। সারি সারি ট্রাকে বিশাল বিশাল সাইজের জ্যান্ত সব মাছ এনে নামানো হচ্ছে মেলায়। ট্রাকের চাকার চাপ আর পানি পড়ে সড়কটি কাদামাখা হয়ে উঠেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে মানুষের গমগম কণ্ঠ। মেলায় ভিড় ঠেলে এগোতেই কানে পড়ল এক বিক্রেতার হাঁকডাক, ‘আমার রুই মাছ খ্যালে কখনোই বাসায় য্যায়া ভুলতে পারবা না। আবার ইচ্ছে হবে ওই ভাইডাক খুঁজি। ফোনে যোগাযোগ করি।’

বিক্রেতার নাম আনোয়ার হোসেন। তিনি মেলায় তোলা তাঁর মাছের সুস্বাদের জানান দিচ্ছেন। তাঁর মতো মেলার সব মাছের দোকানেই ক্রেতা টানতে বিক্রেতাদের এমন হাঁকডাকে এই নবান্নের মাছের মেলা  জমে উঠেছে। জনাকীর্ণ শোরগোলে ক্রেতাদের মুখের হাসি বলে দিচ্ছে, বড় সাইজের পছন্দের মাছ সুলভ দামে কিনতে পেরে তাঁরা দারুণ খুশি। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের উথলী গ্রামে আজ দিনব্যাপী চলছে এই মেলা।

মাছের মেলায় শতাধিক দোকান মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছে। মেলায় আজ এক দিনে মাছের বেচাকেনা হবে কোটি টাকার ওপর।
আল আমিন মিয়া, মেলার ইজারাদার
বিজ্ঞাপন

নবান্ন উৎসব উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী এই মাছের মেলা প্রতিবছর বসে পয়লা অগ্রহায়ণে। তবে তারিখটি সংশোধিত বাংলা বর্ষপঞ্জি মেনে নয়, পুরোনো বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে। হিন্দুধর্মাবলম্বীরা পুরোনো বাংলা বর্ষপঞ্জি ধরেই তাদের পূজা-উৎসব-পার্বণের দিনক্ষণ ঠিক করে। ওই পঞ্জিকা অনুসারে আজ মঙ্গলবার পয়লা অগ্রহায়ণ। দিনটি হিন্দুধর্মাবলম্বীরা নবান্ন উৎসব হিসেবে পালন করে আসছে ঐতিহ্যবাহী কাল ধরে। প্রতিবছর এই উৎসব ঘিরে উথলী গ্রামে মাছের মেলা বসে। আশপাশের রথবাড়ি, গরীবপুর, বেড়া বালা, মোকামতলা, ছোট ও বড় নারায়ণপুর, রহবলসহ জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পুনট, আশপাশের গ্রাম থেকেও লোকজন মেলায় ছুটে আসে। শিবগঞ্জ উপজেলার প্রায় ২০টি গ্রামসহ জয়পুরহাটের বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ প্রতিবছর হেমন্তের প্রথম দিন মাছের মেলার উৎসবে মেতে ওঠে।

default-image

আজ নবান্নের মাছের মেলায় ঢুকেই সারি সারি দোকানগুলোতে চোখে পড়ে মনজুড়ানো সব মাছের পসরা। দূরদূরান্ত থেকে মাছবিক্রেতারা এসেছেন মাছ বিক্রির জন্য। তাঁদের দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো মাছগুলো প্রায় সবই বড় আকারের। মেলায় ছোট মাছ প্রায় নেই বললেই চলে। নিচে দুই কেজি থেকে শুরু করে ওপরে ৩০ কেজি পর্যন্ত সব মাছ। রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, ব্ল্যাক কার্প, পাঙাশ মাছ। চাষের মাছের পাশাপাশি নদীর বাঘাইড় এবং দু-এক প্রকারের সামুদ্রিক মাছও উঠেছে মেলায়। ক্রেতাসমাগমও ব্যাপক। সবাই দরদাম করে মাছ কিনছেন।

মাছের মেলা দেখতে ঢাকার রামপুরা থেকে শিবগঞ্জে শ্বশুরবাড়িতে এসেছেন একটি বুটিক হাউসের মালিক সোনিয়া সুলতানা। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এখানে নবান্ন উৎসব উপলক্ষে মাছের মেলা দেখতে এসেছি। অনেক দিন থেকে শুনছিলাম এখানে বিখ্যাত একটি মেলা বসে। সেটা দেখার জন্য ঢাকা থেকে গত রোববার এসেছি। আজ সকাল সকাল মেলায় ছুটে এসেছি।’

আমি আগে এ রকম মাছের মেলার কথা শুনেছি। কিন্তু কখনো নিজ চোখে দেখা হয়নি। এবার আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছি এই ঐতিহ্যবাহী মেলা দেখব। তাই বরিশাল থেকে এখানে ছুটে এসেছি। আমার জীবনে কখনো এ রকম মেলা দেখিনি।
শায়লা বেগম, ঝালকাঠি থেকে মেলা দেখতে আসা নারী

মেলা দেখতে ঝালকাঠি থেকে এসেছেন শায়লা বেগম। তিন বলেন, ‘আমি আগে এ রকম মাছের মেলার কথা শুনেছি। কিন্তু কখনো নিজ চোখে দেখা হয়নি। মেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামবাসী উৎসবে মেতে উঠেছে। এবার আগে থেকেই পরিকল্পনা করেছি এই ঐতিহ্যবাহী মেলা দেখব। তাই বরিশাল থেকে এখানে ছুটে এসেছি। এই মেলা দেখে আমি অভিভূত। আমার জীবনে কখনো এ রকম মেলা দেখিনি। মাছেরও যে মেলা হতে পারে, তা–ও আবার এত বড়, সত্যিই আমি অবাক হয়েছি। মেলায় এসে ছবি তুলেছি, ভিডিও করেছি সবাইকে দেখাব বলে। সবাইকে এই মেলায় আসতে উদ্বুদ্ধ করব।’ শায়লা বলেন, ‘এখানে আমরা মা–বাবা ও ভাইবোনকে নিয়ে এসেছি। মেলায় এসে অনুভূতিটাই অন্য রকম। সকালে এসে তাজা মাছ দেখে কী যে ভালো লেগেছে। মেলা থেকে আমরা আজ বড় মাছ কিনব।’

default-image

মেলা ঘিরে আত্মীয়স্বজনের ধুম পড়েছে আশপাশের গ্রামের বাড়িগুলোতে। ঘরে ঘরে বড় বড় মাছ ও নতুন সবজি কিনে মেয়েজামাইসহ স্বজনদের আপ্যায়নের আয়োজন চলছে। শিবগঞ্জের মোকামতলা এলাকার মাছের আড়তদার শ্রী নিখিল চন্দ্র মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেলায় সাত ট্রাক মাছ বিক্রি করলাম। প্রায় ২০০ মণের ঊর্ধ্বে। একেকটি মাছের ওজন হবে ৪ থেকে ৩৫ কেজি। সবচেয়ে বড় একটি ব্ল্যাক কার্প মাছ এনেছিলাম। ওজন ছিল প্রায় ৩৫ কেজি।

মেলার ইজারাদার আল আমিন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মাছের মেলায় শতাধিক দোকান মাছের পসরা সাজিয়ে বসেছে। মেলায় আজ এক দিনে মাছের বেচাকেনা হবে কোটি টাকার ওপর।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0