বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দেখতে দেখতে রেলস্টেশনের স্কুলে শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন ৬০টির মতো শিশু পড়ে স্কুলটিতে। কলেজশিক্ষার্থী ইমরান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্টেশনের আশপাশের দরিদ্র, অবহেলিত, যারা পড়ালেখা করতে চাইত না বা তাদের পরিবার পড়ালেখার খরচ দিতে পারত না; যারা একসময় স্টেশনে হকারি করত, নেশাও করত, সেসব ছেলেমেয়ের পড়ালেখা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিই। প্রাথমিকভাবে আমরা তাদের স্কুলে পড়ার যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করি। এ ছাড়া শিক্ষা উপকরণ, স্কুল ড্রেস, খাদ্যসামগ্রী, শীতবস্ত্র, ঈদে বিশেষ খাবার দেওয়া হয়।’ গত পাঁচ বছরে তাঁরা প্রায় ১৫০ শিশুকে স্কুলে ফিরিয়ে দিতে পেরেছেন বলে জানান ইমরান।

ইমরান হোসেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাঐতারা গ্রামের রুহুল আমীনের ছেলে। তিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ ছায়াবীথি এলাকায় থাকেন; পড়েন ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষে।

‘ইশকুলে’ একদিন: গত ২৮ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জয়দেবপুর রেল জংশনে গেলে হঠাৎ বাচ্চাদের কণ্ঠ কানে আসে। সম্মিলিত কণ্ঠে ছড়া বলছে শিশুরা, ‘ঝক ঝকা ঝক ট্রেন চলেছে, রাত দুপুরে ওই। ট্রেন চলেছে ট্রেন চলেছে, ট্রেনের বাড়ি কই?’ বাচ্চাদের কণ্ঠ শুনে রেল জংশনের পশ্চিম পাশে এগোলে একটি চায়ের দোকানের পাশে আমগাছের নিচে ৩০-৩৫ শিশুকে পড়তে দেখা গেল। এক তরুণ তাদের পড়াচ্ছেন। শিশুদের কাছে তিনি ‘স্যার’ নন, ‘ইমরান ভাইয়া’।

সেখানে কথা হয় আলামিন, মাহমুদা আক্তার, ইরামনি ও হোসনে আরার সঙ্গে। আলামিন জানায়, সেখানে রেলস্টেশনে দোকানে পানি এনে দেয়। আবার ট্রেনেও পানি বিক্রি করে। এখনো সেই কাজ করে। তবে সপ্তাহে তিন দিন ক্লাসও করে সে।

মাহমুদা জানায়, সে আগে বাড়িতে মায়ের সঙ্গে কাজ করত। এখন সে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আবার সপ্তাহে তিন দিন মুসাফির ইশকুলেও পড়ে।

খরচাপাতির কথা বলতে গিয়ে ইমরান জানান, প্রতি মাসে ৬০টি শিশুর পেছনে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। বিভিন্ন উৎসবে এ ব্যয় বেড়ে যায়। এ ছাড়া শীতবস্ত্র বিতরণ, স্কুল ড্রেস বিতরণের সময়গুলোতে ব্যয় অনেক বেশি হয়। এ ব্যয় সব সময় মেটানো সম্ভব হয় না। বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজনেরা তখন সহায়তা করেন। সপ্তাহে তিন দিন সকাল নয়টা থেকে বেলা একটা পর্যন্ত স্কুল চলে। দুপুরে খাবার দেওয়া হয়। ‘খাবার না দিলে শিশুরা ওই সময়টুকু থাকবে না,’ বলেন ইমরান।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা: ইমরান বলেন, নিজের বা নিজের পরিবারের চেয়েও এখন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে বেশি চিন্তা করেন। মাঝেমধ্যে অনেক আশাবাদী হন। আবার হতাশও হন। চিন্তা করেন, এসব শিশুকে যদি একটি লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারতেন! এই শিশুদের মধ্যে নৈতিক শিক্ষা এমনভাবে দিতে চান, যেন প্রতিটি শিশুই সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। লেখাপড়া শিখে একদিন দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাকরি করে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ‘আমার ইচ্ছা, এই শিশুরাই একদিন এই মুসাফির ইশকুল পরিচালনা করবে,’ বলেন ইমরান।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন