শুক নদের বুড়ির বাঁধ (জলকপাট) এলাকায় পানি কমার পর মাছ ধরা শুরু হয়েছে। শনিবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায়
শুক নদের বুড়ির বাঁধ (জলকপাট) এলাকায় পানি কমার পর মাছ ধরা শুরু হয়েছে। শনিবার ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায়মজিবর রহমান খান

নদীর বাঁধজুড়ে মানুষের ঢল। কেউ দাঁড়িয়ে বাঁধের ধারে, আবার কেউ কোমরসমান পানিতে। চারপাশে জলের ঝপাৎ-ঝপাৎ শব্দ। নানা বয়সের মানুষ জাল ফেলে মাছ ধরছে। এই চিত্র ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শুক নদের বুড়ির বাঁধ (জলকপাট) এলাকার। দুই দিন ধরে সেখানে মাছ ধরা চলছে।

শুক্রবার রাতে খুলে দেওয়া হয় জলকপাটের দরজা। পানি কমে গেলে শনিবার ভোরে হাতে হাতে ফিকা জাল নিয়ে পানিতে নেমে পড়েন স্থানীয় লোকজন। শুরু হয়ে গেছে মাছ ধরার উৎসব। মাছ ধরার এ উৎসব ঘিরে এলাকাটি পরিণত হয়েছে মিলনমেলায়। প্রতিবছর দু-তিন দিন ধরে এখানে মাছ ধরার উৎসব চলে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে সেচসুবিধার জন্য শুক নদের ওপর বুড়ির বাঁধ নামে একটি জলকপাট (স্লুইসগেট) নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৮২ সালে। জলকপাটে আটকে থাকা পানিতে প্রতিবছর মৎস্য অধিদপ্তর বিভিন্ন জাতের মাছের পোনা ছাড়ে। এসব পোনা যাতে কেউ ধরতে না পারেন, তা দেখভাল করে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ। অক্টোবরের শেষের দিকে সেখানে মাছ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। জলকপাট নির্মাণের পর থেকে সেখানে মাছ ধরার উৎসব চলে আসছে। এতে যোগ দেন আশপাশের গ্রাম ও শহর থেকে আসা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

বিজ্ঞাপন
default-image

শনিবার ভোরে বুড়ির বাঁধ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে, আবার কেউ পানিতে দাঁড়িয়ে জাল ফেলে মাছ ধরছেন। ভিড়ের কারণে একজনের জাল অন্যজনের জালের ওপরে পড়ছে। আর তা নিয়ে চলছে হাসি-তামাশা। এসব দেখে সদর উপজেলার আখানগর গ্রামের মহসিন আলী বললেন, ‘এইঠে যতলা লোক মাছ মারছে বাঁধের পানি ফাঁকা পাওয়া জাসেনি। জাল ফেলাবা গেলেই অন্যের জালের ওপরত পড়ছে।’

এসব বিড়ম্বনা এড়াতে অনেকে আবার কলার ভেলায় ঘুরে ঘুরে মাছ ধরছেন। বাঁধের ওপরে বসেছে খাবার, ফল ও খেলনার দোকান। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষের মোটরসাইকেল ও বাইসাইকেল নিরাপদে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী গ্যারেজ। সেখানে প্রতিটি বাইসাইকেলের জন্য ১৫ ও মোটরসাইকেল রাখতে ৩০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ইয়াসিন আলী বলেন, ‘প্রতিবছর আমরা এই দিনের জন্য অপেক্ষা করি। সকালে থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত তিন কেজি ছোট মাছ ধরতে পেরেছি। তবে এবার পানিতে কচুরিপানা থাকায় জাল ফেলতে সমস্যা হচ্ছে।’

অনেক ব্যবসায়ী মাছ কিনে বাঁধের ওপর বিক্রি করছেন। শহর থেকে আসা মানুষজন সেসব মাছ কিনে নিচ্ছেন। আবার অনেকে এখান থেকে মাছ কিনে শহরের বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন। বিশ্বনাথ দাস নামের এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রতিবছর এ সময়ে মাছ কিনতে চলে আছি। আজ ১৬ হাজার টাকার ছোট মাছ কিনেছি। এগুলো শহরের বাজারে নিয়ে যাব।’

প্রতিবছর আমরা এই দিনের জন্য অপেক্ষা করি। সকালে থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত তিন কেজি ছোট মাছ ধরতে পেরেছি। তবে এবার পানিতে কচুরিপানা থাকায় জাল ফেলতে সমস্যা হচ্ছে।
ইয়াসিন আলী, শিক্ষক
বিজ্ঞাপন

পুরোনো ঠাকুরগাঁওয়ের বাসিন্দা মো. ইউসুফ জানালেন, এই বাঁধের পানিতে বোয়াল, বাইম, শোল, ট্যাংরা, খলসে, পুঁটি, টাকি, মলা, চিংড়িসহ বিভিন্ন জাতের দেশি মাছ বেশি পাওয়া যায়। তবে অনেকের জালে আবার রুই-কাতলা ধরা পড়ে।

প্রতিবছর এ সময় ঠাকুরগাঁও শহরের আশ্রমপাড়া এলাকা থেকে জাল হাতে এখানে চলে আসেন মনিরুল হুদা। তিনি বলেন, ‘মাছ ধরার এই উৎসবে অনেক দিন দেখা নেই—এমন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। আমরা এটাকে মিলনমেলাও বলে থাকি।’

সদর উপজেলার পরিষদের চেয়ারম্যান অরুণাংশু দত্ত বলেন, ‘পানি ছেড়ে দিলে বুড়ির বাঁধ এলাকায় মাছ ধরা উৎসবে পরিণত হয়। আমরা যুগের পর যুগ এ উৎসব ধরে রাখতে চাই।’

মন্তব্য পড়ুন 0