মাছ ধরছেন জেলেরা। প্রতীকী ছবি
মাছ ধরছেন জেলেরা। প্রতীকী ছবিসংগৃহীত

‘৪০ বছরের বন-বাদায় জীবনে এমন দুরবস্থার মধ্যি কোনো দিন পড়িনি। মাছ না হলি কাঁকড়া, আর কাঁকড়া না হলি মাছ ধরতাম। বনে যাওয়া বন্ধ করে দেবায় গেল দুটো মাস আমাগো দুর্গতির শেষ ছেলো না। এখন বনে গিয়ে ডাকাতের ঝামেলা না হলি প্রথম খ্যাপতে ফিরে মহাজনের পাওনা শোধ দেবো।’
প্রায় দুই মাস পর সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে গতকাল মঙ্গলবার। বনে যাওয়ার আগে কথাগুলো বলছিলেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের মুন্সিগঞ্জ গ্রামের জেলে ফজের আলী। তাঁর মতো শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার জেলেদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর জেলেরা নৌকা আর জাল নিয়ে নেমেছেন নদীতে।

বিজ্ঞাপন

করোনা পরিস্থিতি আর জোয়ারের কারণে গত ২৫ জুন থেকে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয় বন বিভাগ। জেলেরা জানান, গত বছর ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের সময়সহ পাঁচ দফায় সুন্দরবনের মাছ ও কাঁকড়া ধরা প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস বন্ধ ছিল। ফলে জেলে পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে। চলতি বছর করোনার কারণে সুন্দরবন এলাকায় সব ধরনের কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই শুরু হয় ঘূর্ণিঝড় আর কয়েক দফার অস্বাভাবিক জোয়ার। ঘরবাড়ি হারিয়ে আরও বিপাকে পড়তে হয়। কাজ না থাকায় এই সময় চরম হতাশের মধ্যে ছিলেন সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকার জেলেরা।
সুন্দরবনসংলগ্ন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের নীলডুমুর গ্রামের জেলে সুলতান গাজী বলেন, ‘প্রায় আড়াই মাস পর বনে যেতিছি। দীর্ঘদিন ধরে বনে যাতি না পারায় ঋণের বোঝা এত বেশি হয়েছে যে টানা চার-পাঁচ মাস কাজ করতি হবে।’

প্রায় আড়াই মাস পর বনে যেতিছি। দীর্ঘদিন ধরে বনে যাতি না পারায় ঋণের বোঝা এত বেশি হয়েছে যে টানা চার-পাঁচ মাস কাজ করতি হবে।
সুলতান গাজী, জেলে, নীলডুমুর গ্রাম, শ্যামনগর, সাতক্ষীরা
বিজ্ঞাপন
শ্যামনগরের প্রায় ৪০ হাজার জেলের জীবিকা নির্ভর করে সুন্দরবনের ওপর। এ ছাড়া এই এলাকার অনেক বাসিন্দা বনে মধু সংগ্রহ করেও জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই তাঁদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। আবার উপকূলসংলগ্ন এলাকায় বসতি হওয়ায় বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শ্যামনগরের প্রায় ৪০ হাজার জেলের জীবিকা নির্ভর করে সুন্দরবনের ওপর। এ ছাড়া এই এলাকার অনেক বাসিন্দা বনে মধু সংগ্রহ করেও জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এলেই তাঁদের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। আবার উপকূলসংলগ্ন এলাকায় বসতি হওয়ায় বাড়িঘরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সুন্দরবনে গিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে না পারারও উদাহরণ আছে। প্রায়ই বনদস্যুদের কবলে পড়তে হয় জেলেদের। গতকাল মঙ্গলবার যাঁরা বনে যাচ্ছিলেন, তাঁরাও একই কথা বলেন। তাঁদের আশঙ্কা দীর্ঘদিন জেলেদের বনে প্রবেশ বন্ধ থাকায় দস্যুরাও চাঁদাবাজি করতে পারেনি। জেলেদের সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগে বনদস্যুরাও আবার তৎপর হতে পারে।
পশ্চিম সুন্দরবনের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান আহমেদ জানান, গতকাল প্রায় চার শ জেলে অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে ঢুকেছেন। দীর্ঘ সময় জেলেরা বনে না যাওয়ায় তাঁরা এবার মাছ ও কাঁকড়া শিকার করে লাভবান হবেন। ডাকাতের উপদ্রবের বিষয়টি মাথায় রেখে বনেও বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0