বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৪টি আইসিইউ শয্যা থাকলেও বাকিগুলোয় নেই। সম্প্রতি ভোলা সদর হাসপাতালে তিনটি এবং পটুয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে পাঁচটি আইসিইউ শয্যা বসানো হলেও সেগুলো এখনো চালু হয়নি। বরগুনার ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি হাসপাতালে এখনো আইসিইউ শয্যা নেই।

নমুনা পরীক্ষার জন্য বরিশাল ও ভোলায় দুটি আরটি-পিসিআর ল্যাব থাকলেও তাতে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩০০ নমুনা পরীক্ষা করা যায়। ফলে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। ফলে এসব নমুনা পরীক্ষার ফল পেতে তিন থেকে চার দিন, কোনো কোনো সময় এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে, পরিবার ও বাইরে ঘোরাফেরা করায় এদের সংস্পর্শে সংক্রমণ গতি পাচ্ছে।

কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা নেই ৩৯ হাসপাতালে

৬টি জেলা সদর হাসপাতাল ও ৪২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মিলিয়ে বরিশাল বিভাগের সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৪৮। কিন্তু এসব হাসপাতালের ৩৯টিতেই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা নেই। এসব হাসপাতালে এখনো রোগীদের প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহার করা হয় সিলিন্ডার ভর্তি অক্সিজেন। এসব সিলিন্ডারে সর্বোচ্চ ১২ লিটার অক্সিজেন থাকে। চিকিৎসকদের একটি সূত্র জানায়, উচ্চ শ্বাসকষ্টের রোগীদের ক্ষেত্রে এসব সিলিন্ডার মাত্র কয়েক মিনিট সাপোর্ট দিতে সক্ষম। কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা ছাড়া এসব রোগীকে সুরক্ষা দেওয়া কঠিন।

স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র বলছে, বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কেবল ২০ হাজার লিটার অক্সিজেন সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বাকি চারটি জেলা হাসপাতালে মেনিফোল্ড পদ্ধতির অক্সিজেন ট্যাংকারগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ৩ হাজার ৪২০ লিটার করে। এর বাইরে উপজেলা পর্যায়ে গৌরনদী, দুমকি এবং মির্জাগঞ্জে রয়েছে ছোট আকারের মেনিফোল্ড অক্সিজেন রিজার্ভার। এগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ৭২০ লিটার করে।

বিভাগের অধিকাংশ হাসপাতালে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা না থাকায় সিলিন্ডারভর্তি অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে জরুরি রোগীদের সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পুরো বিভাগে সিলিন্ডার আছে মাত্র ১ হাজার ৫২৬টি, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়া করোনাসহ শ্বাসকষ্টের গুরুতর রোগীদের জীরন রক্ষায় হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা বেশ কার্যকর হলেও তাও অপ্রতুল। বিভাগে মোট ৭৫টি হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা রয়েছে। এর মধ্যে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫৯টি ক্যানুলার থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে ৫১টি।

১০৯৮ চিকিৎসকের আছে ৫৩৬

বিভাগের জেলা ও উপজেলার সব কটি হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু সেই কাঠামো অনুযায়ী জনবলেও রয়েছে চরম সংকট। ফলে, সেবা ব্যাহত হচ্ছে। পুরোনো জনবলকাঠামো অনুযায়ী বিভাগের হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসকের পদ রয়েছে ১ হাজার ৯৮টি। সেখানে চিকিৎসক আছে অর্ধেকেরও কম। এই সংখ্যা ৫৩৬।
বিভাগের সবচেয়ে বড় ও প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চলছে ৩৫০ শয্যার জনবল দিয়ে। অথচ এই হাসপাতাল অনেক বছর আগে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এর ওপরে করোনার জন্য আলাদা একটি হাসপাতাল খোলা হয়েছে। কিন্তু পুরোনো ৩৫০ শয্যার জনবলকাঠামো অনুযায়ী এই হাসপাতালে চিকিৎসকের মোট পদ ২২৪ জন হলেও কর্মরত মাত্র ৮৪ জন।
সংক্রমণের উল্লম্ফন নিয়ে উদ্বেগ
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয় মে মাসের শুরুতে। মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত সংক্রমণ অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও ১৬ জুনের পর তা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বরিশাল, পিরোজপুর ও ঝালকাঠি জেলায় সংক্রমণ বাড়ছে। ১৭ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ১৪ দিনে বিভাগে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ৫৪৩ জন। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ৫৭৫, পিরোজপুরে ৪০৫ ও ঝালকাঠিতে ২৮০ জন। ৩০ জুন পর্যন্ত বিভাগে করোনায় মোট মারা গেছেন ৩০৩। এ ছাড়া শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের আইসোলেশনে উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ৫২৭ জন।

পরিস্থিতি প্রতিদিনই অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে পিরোজপুরে ভারতীয় ধরন শনাক্ত হওয়ার ঘটনায় শুরুতেই পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশাল জেলা নিয়ে উদ্বেগ ছিল স্বাস্থ্য বিভাগের। ১৫ দিন ধরে এই তিন জেলায় সংক্রমণের গতি সেই আশঙ্কারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এর সঙ্গে ঢাকা এবং বড় শহর থেকে গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসা মানুষ নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বরিশাল জেলা সভাপতি অধ্যাপক শাহ সাজেদা বলেন, কঠোর লকডাউনের ঘোষণা আসার পর এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ নানাভাবে গ্রামে ফিরেছে। এসব মানুষ গ্রামে ফিরে পরিবার এবং হাটবাজারে অবাধে ঘুরছে এবং সবার সঙ্গে মিশছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রামেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে। পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে স্বাস্থ্য বিভাগের সক্ষমতা না বাড়ালে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে যদি ছোট আকারেরও একটি করে মেনিফোল্ড রিজার্ভার এবং কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা থাকত, তাহলে হয়তো করোনাসহ অন্যান্য শ্বাসকষ্টের রোগে মৃত্যুর হার অনেক কমে যেত।

জানতে চাইলে বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, পর্যায়ক্রমে বিভাগের সব কটি হাসপাতালেই কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। এরই মধ্যে কয়েকটি উপজেলায় করা হয়েছে। গত দেড় বছরে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। বরং সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানলে পরিস্থিতি অনুকূলেই থাকবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন