সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই, কমছে টমেটোর আবাদ

উৎপাদিত টমেটো আড়তে রাখা ছাড়া অন্য কোনোভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। দাম কম পাওয়ায় চাষিরা দিন দিন টমেটোর চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন।

পঞ্চগড়ে দিন দিন কমে যাচ্ছে টমেটোর আবাদ। কৃষকেরা বলেন, এলাকায় টমেটোর সংরক্ষণাগার বা হিমাগার নেই। তাঁরা সুবিধামতো সময়ে টমেটো বিক্রি করতে পারেন না। প্রতি বছর উৎপাদিত টমেটোর একটি বড় অংশ পচে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে তাঁদের ক্ষতি হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ বছরে (২০১৭ থেকে ২০২২) ২ হাজার ৩৪২ হেক্টর জমিতে টমেটোর আবাদ কমেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে টমেটোর চাষ হয়েছিল ৩ হাজার ১১৪ হেক্টর জমিতে। আর টমেটোর উৎপাদন হয়েছিল ৯৭ হাজার ১৯৪ মেট্রিক টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৯৩০ হেক্টর জমিতে ৪০ হাজার ৯৬৩ মেট্রিক টন টমেটো হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে মাত্র ৭৭২ হেক্টর জমিতে টমেটো চাষ হয়। যা থেকে টমেটো উৎপাদন হয় ৩১ হাজার ৮৭৪ মেট্রিক টন।

টমেটোচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি টমেটো চাষ হয় সদর উপজেলায়। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রীষ্মকালীন টমেটোর বীজ বপন করা হয়। জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে শুরু করে প্রায় এক মাস চলে টমেটোর চারা রোপণ। মার্চ মাসের শুরুর দিকে অল্প কিছু ফল আসতে শুরু করে। টমেটো উৎপাদনের ভরা মৌসুম এপ্রিল ও মে মাস। তবে কিছু উঁচু জমিতে জুন মাসেও টমেটো সংগ্রহ চলে। প্রতি বিঘা টমেটোর খেত থেকে ২০০–২৫০ মণ টমেটো সংগ্রহ করা যায়।

ব্যবসায়ীরা বলেন, প্রতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টমেটো ব্যবসায়ীরা এসে জেলা সদরের বিভিন্ন এলাকায় আড়ত ভাড়া নেন। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় তাঁরা প্রতিদিন চাষিদের খেত থেকে কাঁচা টমেটো কিনে আড়তে সংরক্ষণ করেন। পরে আড়তে রাখা টমেটো পাকা পর্যন্ত শ্রমিকদের দিয়ে চারবার বাছাই করে ঝুড়িতে (ক্যারেট) ভরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করেন। প্রতিটি ঝুড়িতে ২৬ কেজি করে টমেটো ধরে। তবে খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে কৃষকের কাছ থেকে প্রতি মণ টমেটোতে দুই কেজি বেশি নেন ব্যবসায়ীরা। অর্থাৎ ৪২ কেজিতে মণ কেনেন তাঁরা। গড়ে প্রতি ৪২ কেজিতে ৬ কেজি টমেটো পচে যায়। জেলায় টমেটো সংরক্ষণের জন্য কোনো হিমাগার থাকলে বা স্থানীয়ভাবে কোনো প্রক্রিয়াকরণ কারখানা গড়ে উঠলে এত বিপুল পরিমাণ টমেটো নষ্ট হতো না।

সদর উপজেলার কৃষকেরা বলেন, প্রতি বিঘা টমেটো চাষে খরচ হয় ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা। সচরাচর মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ টমেটো ৪৫০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হয়। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন টমেটোখেত থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতি মণ বিপুল প্লাস টমেটো কিনছেন ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায়। আর ঝিলিক জাতের প্রতি মণ টমেটো ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে সবাই খেত থেকে টমেটো তোলায় দাম কমে যায়। তখন টমেটো ব্যবসায়ীরা তাঁদের ইচ্ছেমতো দরে টমেটো কিনে থাকেন। এতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন কৃষকেরা।

মারুপাড়া এলাকার আল আমিন বলেন, এপ্রিলের শেষের দিক থেকে মে পর্যন্ত টমেটোর দাম কম থাকে। আর এই সময় সামান্য বৃষ্টি হলেই ব্যবসায়ীরা আরও বেঁকে বসেন। টমেটো এমন ফসল যে ঘরে রাখারও কোনো উপায় থাকে না। বাধ্য হয়েই অনেক সময় কম দামে বিক্রি করতে হয়।

ব্যবসায়ীরা বলেন, টমেটো কেনার পর তা বেশি দিন রাখা যায় না। আড়তে সিলিং ফ্যানের মাধ্যমে ২০ থেকে ২৫ দিন টমেটো রাখার চেষ্টা করেন তাঁরা। তবে গরমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ টমেটো নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে মৌসুমের শেষ দিকে বৃষ্টি হলে টমেটো নষ্টের পরিমাণ বেড়ে যায়।

শরীয়তপুর থেকে আসা টমেটো ব্যবসায়ী মো. দাদন বলেন, খেত থেকে কাঁচা টমেটো কেনার পর থেকেই শুরু হয় বাছাই। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন শ্রমিক টমেটো বাছাই করেন। পাকা পর্যন্ত চারবার বাছাই শেষে ঝুড়িতে ভরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। পচা টমেটো বাছাইয়ের জন্যই প্রতিদিন ২০ হাজার টাকা শ্রমিকদের মজুরি দিতে হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামীম বলেন, পঞ্চগড়ে উৎপাদিত টমেটো আড়তে রাখা ছাড়া অন্য কোনোভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নেই। বাজারমূল্য কম পাওয়ায় চাষিরা দিন দিন টমেটোর চাষ কমিয়ে দিচ্ছেন।

পঞ্চগড় চিনিকলের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. ইউসুফ আলী বলেন, পঞ্চগড় চিনিকল বহুমুখী উৎপাদনে কাজে লাগাতে ইতিমধ্যে সরকারের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে টমেটোর সস তৈরির কারখানা স্থাপনেরও প্রস্তাব রয়েছে।