মাথায় থাকা টুপির বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ বলেন, ‘এইডার নাম পঙ্খিরাজ। বেত টোকাইয়া বানাইছি।’ প্লাস্টিকের বেতের তৈরি টুপির ওপর চাকতির মতো গোল ছাউনি দেওয়া হয়েছে। তার ওপর বসানো হয়েছে ‘পঙ্খিরাজ পাখি’। রোদ–বর্ষা মাথায় নিয়েই শহরে তাঁকে রিকশা চালাতে হয়। টুপি তখন ছাউনি হিসেবে কাজ করে। নকশা করে পাখি বসানোর কারণ কেবল শখ নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘শহরে কেউ আমারে চেনে না। ভাবলাম টুপির উপর নকশা কইরা ঘুরলে মানুষ আমারে দেখব, মনে রাখব।’

আরিফের বাবার বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে। ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়ায় স্ত্রী আর দুই মেয়েকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জ এলাকায় থাকেন তিনি। খাদ্যপণ্যের জন্য বিখ্যাত নিতাইগঞ্জের পথেঘাটে ফেলে দেওয়া পণ্যের মোড়কের সঙ্গে প্লাস্টিকের বেত ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকে। আরিফ সেসব বেত কুড়িয়ে নিজের হাতে টুপি বানিয়েছেন। বাড়িতে আরও তিন বস্তা বেত কুড়িয়ে রেখেছেন। নিজের যখন বাড়ি হবে, তখন এসব কাজে লাগিয়ে বাড়ির মধ্যে নিজের হাতে নকশা করবেন বলে জানান।

আরিফ জানান, ছোটবেলায় তাঁর পড়ায় মন বসেনি। পড়াশোনার জন্য শিকলবন্দী করে তাঁকে মারধর করা হতো। নয় বছর বয়সে সেই শিকল ভেঙে বাড়ি ছাড়েন আরিফ। তারপর তিন বছর ঢাকার সদরঘাটে লঞ্চে লঞ্চে পানি বিক্রি করেন। এরপর একদিন নিজে থেকেই বাড়ি ফেরেন। তাঁকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা মা–বাবা আর পড়ার জন্য চাপ দেননি। স্থানীয় একটি ওয়ার্কশপে কাজে লেগে যান। বাবার কাছে এটা চান, ওটা চান। দিতে না পারলে অভিমানে বারবার বাড়ি ছাড়েন। আবার নিজ থেকেই ফিরে আসেন। ছেলের এসব কাণ্ডে চিন্তিত মা–বাবা এবার আরিফকে বিয়ে দেন পাশের গ্রামে। বিয়ে করে যদি তাঁদের ছেলের জীবনে ‘স্থিতি’ আসে।

বিয়ের পর কি ছেলে শান্ত হলো? এ প্রশ্নের জবাবে আরিফ বলেন, ‘বিয়ার পর না। প্রথম মাইয়াডা হওনের পর কেমন যেন মায়ায় জড়াইয়া গেলাম। আবার আরেকটা মাইয়া হইল। ওদের জন্ম হইল সিজারে। পুরা টাকাটা কিস্তিতে আনছিলাম। মাইয়াগো লালন–পালন করতে গিয়া পাল্টাইয়া গেলাম।’ আরিফের চার বছরের মেয়ের নাম আলিফা আক্তার। দেড় বছরের মেয়ের নাম রহিমা আক্তার।

বড় মেয়ে জন্মের পর স্ত্রী–সন্তান নিয়ে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন বলে জানান আরিফ। ছয় হাজার টাকা দিয়ে পুরোনো রিকশা কেনেন। দিনে তাঁর ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা উপার্জন হয়। রিকশা মেরামত আর সারা দিনের খরচ শেষে যা থাকে, তা দিয়া কিস্তি দেন আর সংসার চলে।

ঈদ সামনে রেখে স্ত্রী–সন্তানদের বাড়ি পাঠিয়েছেন আরিফ। কথা ছিল ঈদের আগেই সবার জন্য নতুন জামাকাপড় নিয়ে বাড়ি ফিরবেন তিনি। তিন দিন আগে ইজিবাইকের ধাক্কায় তাঁর রিকশা উল্টে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিকশা মেরামত করতে গিয়ে ঈদের জন্য জমানো টাকা শেষ। তা নিয়েই আরিফের ভাবনা। বলেন, ‘মাইয়া দুইটায় তো চাইতে পারে না। কিন্তু বাপ হইয়া মাইয়াগো ঈদে পুরান জামা পরতে দেখলে কষ্ট লাগব। আগে বুঝতাম না। বাপের কাছে চাইয়া না পাইলে কত রাগ করছি, বাড়ি ছাড়ছি। বাপ হওয়ার পর এহন বুঝি। সন্তানগো না দিতে পারলে বাপেগো বুকটা ফাইট্টা যায়।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন