বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: সিলেট শহরে পাকাপাকিভাবে এলেন কবে?

আব্দুল আজিজ: স্কুলের ছাত্রাবস্থায় নানা সময়ে, নানা প্রয়োজনে সিলেট শহরে এসেছি। ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকার কারণেও ঘটনাচক্রে শহরে আসতে হয়েছে। তবে ম্যাট্রিক পাস করে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে ১৯৫২ সালে যখন কলেজে ভর্তি হই, তখনই সিলেটে পাকাপাকিভাবে আসি।

আমি এমসি কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম। তখন কলেজে ভর্তি হতে হলে আমাদের ভর্তি পরীক্ষা দিতে হতো না। অধ্যক্ষ সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার নিতেন। ইংরেজিতে কিছু প্রশ্ন করতেন এবং ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফলাফল দেখে শিক্ষার্থীদের ভর্তির জন্য নির্বাচন করতেন। আমাদের সময়ে কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন আবু হেনা। আমি তখন সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলাম দিলওয়ার ও রিয়াছত আলীকে। তাঁরা দুজনেই তখন কবি হিসেবে খুব পরিচিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দিলওয়ার তো গণমানুষের কবি হিসেবেই দেশবরেণ্য হন।

প্রথম আলো: এমসি কলেজে পড়াকালীন স্মৃতি যদি একটু বলতেন।

আব্দুল আজিজ: এখন যেখানে কলেজের অবস্থান, অর্থাৎ টিলাগড় এলাকায়, সেটা আমাদের সময়ের হিসাবে বলা চলে শহরতলিতেই অবস্থিত। ফলে মূল শহর থেকে কলেজটিকে আমাদের কাছে তখন বেশ দূরের জায়গা বলেই মনে হতো। সবুজ-শ্যামল টিলাঘেরা অসম্ভব সুন্দর ছিল আমাদের কলেজ।

আমি জায়গির থেকে পড়াশোনা করতাম। সেকালে আমরা পায়জামা ও শার্ট পরেই কলেজে যেতাম। কেউ কেউ অবশ্য প্যান্ট ও শার্ট পরতেন। তবে ইন করতেন না কেউ। কারণ, কেউ ইন করলে সবাই সেটিকে ‘বাবুগিরি’ বলে অভিহিত করতেন। তখন বেশির ভাগ শিক্ষক স্যুট-টাই পরতেন। অবশ্য দু-একজন এর ব্যতিক্রমও ছিলেন।

ছাত্রদের অনেকে বাইসাইকেল চালিয়ে কলেজে আসতেন। কেউ কেউ অবশ্য হেঁটেও আসতেন। অনেক শিক্ষকও বাইসাইকেল চালিয়ে কলেজে আসতেন। কলেজ ছুটির পর দেখা যেত, মূল শহরের দিকে যে রাস্তাটা গেছে, সেখান দিয়ে সারি সারি বাইসাইকেল চলছে। অন্যদিকে, যাঁদের বাইসাইকেল ছিল না, তাঁদের অনেকে রিকশায় চেপে শহরে যেতেন। একেকজন যাত্রীকে রিকশার জন্য চার আনা ভাড়া দিতে হতো। অবশ্য সেকালে সিলেট শহরের যেকোনো স্থানে যেতে হলে রিকশা ভাড়া চার আনাই দিতে হতো।

প্রথম আলো: আপনার কলেজজীবনের সিলেট অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকের সিলেট কেমন ছিল?

আব্দুল আজিজ: তখন তো এক কাপ চা পাওয়া যেত এক আনায়। কারও হাতে এক টাকা থাকলে পেট ভরে যেকোনো রেস্টুরেন্টেই তিনি খেতে পারতেন। সে সময় শহরের মানুষজন, বিশেষ করে সন্ধ্যার সময় সুরমা নদীর তীরে গিয়ে আড্ডা দিতেন। তীরে বেশ কিছু বেঞ্চ পাতা ছিল। সেখানেই বসে মানুষ আড্ডা দিত। প্রগতিশীল নানা আন্দোলন-সংগ্রামে সম্পৃক্ত থাকার কারণে সে সময়কার রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য অঙ্গনের অনেকের সঙ্গে আমার ভালো যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। এতে এ শহরের এ-সংক্রান্ত নানা ঘটনা নিজের চোখে দেখেছি। পরে আইএ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আমি ঢাকাবাসী হই।

প্রথম আলো: তখন সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিবেশ কেমন ছিল?

আব্দুল আজিজ: তখন জিন্নাহ হলকে ঘিরেই সাহিত্য-সংস্কৃতির কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। এই জিন্নাহ হল সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদের (কেমুসাস) নিজস্ব হল ছিল। এখন এই হল অবশ্য মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সুলেমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। কেমুসাসের সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে আমরা নিয়মিত বইপত্র পাঠ করতে যেতাম। সে সময়ে লিয়াকত হোসেন, রাখি চক্রবর্তী, প্রভাতী শ্যাম প্রমুখ উদীয়মান সংগীতশিল্পী ছিলেন। ‘সুরসাগর’ অভিধায় পরিচিত ওস্তাদ প্রাণেশ দাস তখন গান শেখাতেন। অসাধারণ একটা সময় ছিল তখন।

প্রথম আলো: আপনার কর্মজীবন শুরু কবে এবং কোথায়?

আব্দুল আজিজ: ১৯৫৯ সালে এমএ পাস করি। ওই বছরের ১ আগস্ট সিলেট শহরের মদনমোহন কলেজে আমার শিক্ষকতা জীবনের শুরু হয়। তবে চাকরি পেলেও থাকার জায়গা পেতে সমস্যা হচ্ছিল। বলে রাখা ভালো, ষাটের দশকে সিলেট শহরে প্রচণ্ড রকমের আবাসনসংকট ছিল। অবিবাহিতদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া হতো না বললেই চলে। তখন কলেজজীবনের এক বন্ধু, যিনি ব্যবসায়ী, তাঁর সঙ্গে তাঁর দোকানেই থাকতাম এবং বাইরে হোটেলে খেতাম। কিন্তু সিলেটের হোটেলগুলোতে প্রচুর পরিমাণে মসলা দিয়ে তরকারি রান্না হতো। ফলে নিয়মিত হোটেলে খেয়ে একসময় অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরে আমার এক সদ্যবিবাহিত বন্ধুর বাসায় ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসেবে উঠে আবাসন ও খাবারের সমস্যা থেকে রক্ষা পেলাম।

প্রথম আলো: আচ্ছা, কবি দিলওয়ার তো আপনার সহপাঠী ও অন্তরঙ্গ বন্ধু। তাঁকে নিয়ে কিছু স্মৃতি শুনতে চাই।

আব্দুল আজিজ: ১৯৫২ সালের অগ্নিঝরা সময়ে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। সুরমা নদীর দক্ষিণ পারে ভার্থখলায় তাঁদের বাসা। সে তখনই ছিল কবি হিসেবে সুপরিচিত। তাঁর পুরো নাম ছিল দিলওয়ার খান। পরে পদবি ছাড়া কেবল দিলওয়ার নামেই লেখালেখি করতেন। ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসের নিশানা পত্রিকায় প্রতিষ্ঠিত অনেক কবির সঙ্গে তখনকার তরুণ কবি দিলওয়ারের ‘একটি জবাব’ শিরোনামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। আমরা এ ঘটনায় রীতিমতো রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম।

দিলওয়ারকে নিয়ে তো স্মৃতির শেষ নেই। কোনটা রেখে কোনটা বলব? তিনি কিন্তু ভালো গানও লিখতেন। ১৯৬৭ সালে সিলেট বেতার কেন্দ্র যাত্রাই শুরু করেছিল তাঁর লেখা গানটি দিয়ে। সে গানটি হচ্ছে ‘তুমি রহমতের নদীয়া’। তাঁর লেখা অসংখ্য কবিতা জনপ্রিয়তা পেয়েছে। পরে তো একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পদকসহ নানা সম্মাননাও তিনি অর্জন করেছেন।

প্রথম আলো: আপনি নিজেও লেখালেখি করেন। বৈচিত্র্যময় বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি সিলেটের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়েও অসংখ্য লেখা লিখেছেন। এসব বিষয়ে যদি কিছু বলতেন।

আব্দুল আজিজ: রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে সিলেট, কালের যাত্রার ধ্বনি, চেনা লোক জানা মানুষ, স্মৃতি বিস্মৃতির প্রজন্ম, গল্প শোনার দিনগুলো, মুরারিচাঁদ কলেজের ইতিকথা, সিলেটের অর্থনৈতিক ইতিহাসের রূপকথাসহ আমার লেখা বিভিন্ন বই আছে। এসব বই পাঠে সিলেট অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও গুণী ব্যক্তিদের নিয়ে জানার সুযোগ ঘটবে পাঠকের।

প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

আব্দুল আজিজ: প্রথম আলোকেও ধন্যবাদ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন