সাংসদ, প্রশাসন ও ‘অবৈধ’ নিয়োগপ্রাপ্তদের আলোচনা, আন্দোলন স্থগিত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ফাইল ছবি

রাজশাহীর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) অ্যাডহকে ‘অবৈধ’ নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা। আজ সোমবার প্রায় তিন ঘণ্টার সভা শেষে বেলা তিনটার দিকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানান চাকরিপ্রত্যাশীরা। তবে সভা শেষে চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে ক্ষোভও দেখা গেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক উপাচার্য এম আবদুস সোবহানের শেষ দিনে ‘অবৈধভাবে’ নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা গত শনিবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসে নিজ নিজ পদে যোগদানের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। দুই দিন তালাবদ্ধ রাখার পর দ্বিতীয় দিন রোববার রাতে তাঁরা রুটিন উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহার বাসভবনসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ভবনের তালা খুলে দেন। পরে চাকরিপ্রত্যাশীরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের কাছে গিয়েছিলেন। তাঁদের আশ্বাসে গতকাল রোববার রাতে বিভিন্ন ভবনের তালা খুলে দেন বলে জানা গেছে।

আজকের আলোচনায় সভায় অংশ নেন রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. আয়েন উদ্দিন, রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। প্রশাসনের পক্ষে ছিলেন রুটিন উপাচার্য অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা, সহ-উপাচার্য চৌধুরী মো. জাকারিয়া ও ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর লিয়াকত আলি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের দ্বিতীয় তলায় কনফারেন্স কক্ষে আলোচনা শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টায়। পরে বেলা পৌনে দুইটার দিকে চাকরিপ্রত্যাশীদের কয়েকজন গিয়ে আলোচনায় যোগ দেন। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে আলোচনা শেষ হয়।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ফাইল ছবি

আলোচনা শেষে সাংসদ আয়েন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘এটা অস্বীকার করা যাবে না এই নিয়োগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের আন্দোলনের কারণে ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবগত। তাদের নির্দেশে তাঁরা এখানে আলোচনায় বসেছিলেন। আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। তাঁরা আন্দোলন স্থগিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে যাক। শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক হোক। আশা করি, শিগগিরই এর একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।’
সাংসদ আরও বলেন, চাকরিপ্রত্যাশীরা পাশেই আছেন। তাঁরা সভা শেষে হাসিমুখেই কিন্তু বের হয়েছেন। যে সমস্যাটা হয়েছে, সেটা তাঁরা প্রাথমিকভাবে সমাধান করতে পেরেছেন। এই বিষয়টির স্থায়ী সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রয়েছে, সরকারের পক্ষের লোকজন আছেন, এটা পরবর্তী সময়ে স্থায়ী সমাধান হবে এবং এটা তাঁরা প্রত্যাশাও করেন, এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, ‘আগের উপাচার্য একটি নিয়োগ দিয়ে গেছেন। সেই নিয়োগপ্রাপ্তরা দীর্ঘ দেড় মাস ধরে আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। এ সময়ের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, তখন চাকরিপ্রত্যাশীরা ভয় পাচ্ছেন যে তাঁদের নিয়োগটা বাতিল করবে হয়তো। সে কারণেই হয়তো চাকরি পাওয়া ব্যক্তিরা প্রশাসনের সঙ্গে বাক্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে যাচ্ছেন এবং চাকরির দাবিতে প্রশাসন ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে আমাদের ওপর নির্দেশনা আছে, যাতে ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে। এ বিষয়েই আজকে তাঁরা আলোচনা করেছেন দুই পক্ষের সঙ্গে। প্রশাসনও বলছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা চাকরি পেলে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। তাঁদের দুই পক্ষই বলেছেন, যাতে শিক্ষা মন্ত্রলণালয়ে যোগাযোগ করে বিষয়টি সমাধান করা হয়। সব মিলিয়ে তাঁদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে।’

এ সময় পাশে থাকা নিয়োগপ্রাপ্ত রাজশাহী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক ফারদিন বলেন, ‘আমাদের দাবির বিষয়টি রাবি ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাংসদ আয়েন উদ্দীন ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু ভাইকে জানিয়েছি। তাঁরা আজ প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আমরাও বৈঠকে ছিলাম। সমস্যা সমাধানে আলোচনা করেছেন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তাঁদের আশ্বাসে আমরা আন্দোলন স্থগিত করছি।’

অধ্যাপক আনন্দ কুমার সাহা বলেন, ‘আমরা আজ দীর্ঘক্ষণ আলোচনা করেছি। এ নিয়োগ প্রসঙ্গে সাংসদ সদস্য আয়েন উদ্দিন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করবেন বলে জানিয়েছেন। আশা করি, দ্রুত এর একটি স্থায়ী সমাধান আসবে।’

চাকরিপ্রত্যাশীদের ভেতরে ক্ষোভ

সভা শেষে বিকেল চারটার দিকে ক্যাম্পাস ছেড়ে যান সাংসদ আয়েন উদ্দিন ও ডাবলু সরকার। পরে চাকরিপ্রত্যাশীরা প্রশাসন ভবনের পাশে লিচুতলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলেন। তাঁরা জানান, তাঁদের নিয়োগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ কাজ করছে। কিন্তু রুটিন উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা চাচ্ছেন, যেকোনোভাবে এই নিয়োগটিকে বাদ দিতে। তাঁরা এটা হতে দেবেন না। ক্যাম্পাসে পুলিশ দেখিয়ে ভয় দেখানো যাবে না। তাঁরা ১৩৮ জনকে নিয়ে চাকরি নিশ্চিত করতেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে যাতে কোনো সমস্যা না হয়। তাঁরা ক্যাস্পাসের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা তৈরি করবেন না। কিন্তু রুটিন উপাচার্য যেকোনো সময় তাঁদের নিয়োগ নিয়ে সমস্যা করতে পারেন। এ জন্য সবাইকে ক্যাম্পাসে প্রতিদিন আসতে হবে। আপাতত তাঁরা আন্দোলন স্থগিত করলেন। তবে তাঁদের বিপক্ষে কোনো কার্যক্রম করা হলে তাঁরা আন্দোলন করবেন। আন্দোলন ছাড়া তাঁদের চাকরি স্থায়ী হবে না। এ পর্যন্ত বিষয়টি এসেছে শুধু আন্দোলনেরই জন্য।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ নিষেধাজ্ঞাকে তোয়াক্কা না করে আবদুস সোবহান উপাচার্য হিসেবে শেষ কর্মদিবসে (৬ মে) ১৩৮ জনকে অ্যাডহকে (অস্থায়ী) নিয়োগ দিয়ে পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়েন। সেদিন এ নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় ও মহানগর ছাত্রলীগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এই নিয়োগকে অবৈধ ঘোষণা করে সেদিনই বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তদন্ত করে গত ২৩ মে তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। শেষে অবৈধ নিয়োগে তদন্ত কমিটি বিদায়ী উপাচার্যসহ বেশ কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পেয়েছে। আবদুস সোবহানের দেশত্যাগেও নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তবে এখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয় দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর মধ্যেই নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিরা যোগদানের জন্য ক্যাম্পাসে আন্দোলন করছেন।