‘সাধারণ জ্বর’ভেবে নমুনায় অনাগ্রহ, বাড়ছে সংক্রমণ

করোনাভাইরাস
প্রতীকী ছবি

আবদুস সালাম (৫০) কয়েক দিন ধরে জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ভুগছিলেন। গত সোমবার চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এলে তাঁকে নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দেন এক চিকিৎসক। সাধারণ জ্বর ভেবে নমুনা না দিয়েই ফেরেন বাড়ি। শ্বাসকষ্ট বাড়ায় গত বৃহস্পতিবার পুনরায় ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন। সেখানে নমুনা দেওয়ার আগেই মারা যান তিনি।

উপসর্গ নিয়ে সালামের স্ত্রীও নমুনা পরীক্ষায় দেরি করেন। তিন-চার দিন উপসর্গে থেকে গত মঙ্গলবার ভর্তি হন জেলার জেনারেল হাসপাতালে। নমুনা পরীক্ষায় সেখানে তাঁর করোনা শনাক্ত হয়। সালামের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলার ফতেপুর গ্রামে। তাঁর মতো এভাবে জ্বরে আক্রান্ত অনেকেই ‘সাধারণ জ্বর’ ভেবে করোনার নমুনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। মেলামেশা করছেন পরিবার ও আশপাশের লোকজনের সঙ্গে। ঘুরে বেড়াচ্ছেন এখানে-ওখানে। পরে নমুনা পরীক্ষায় পজিটিভ হয়েছেন। এসব কারণে সংক্রমণের হার ও ঝুঁকি বাড়ছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলার আট উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি করোনা শনাক্ত হয় সদর উপজেলায়। সেখানে আজ শনিবার দুপুর পর্যন্ত এক হাজারের বেশি লোকের করোনা শনাক্ত হয়। শনাক্তের দিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মতলব দক্ষিণ। এখানে এ পর্যন্ত নমুনা সংগ্রহ করা হয় ১ হাজার ৩৫৫টি। করোনা শনাক্ত হয় ৬০৭ জনের। করোনায় মারা যান আটজন। উপসর্গ নিয়ে মারা যান আরও ১৫ জন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় করোনা শনাক্ত ওই ৬০৭ জনের মধ্যে চলতি জুলাই মাসেই শনাক্ত হয় ২২৮ জনের। জুলাইয়ে নমুনা নেওয়া হয় ৫২৪টি। নমুনা বিবেচনায় সংক্রমণ সাড়ে ৪৩ শতাংশের বেশি। গত রোববার থেকে আজ শনিবার পর্যন্ত সাত দিনে সেখানে চিকিৎসা নেন মোট ১ হাজার ৫০ জন। এর মধ্যে জ্বর ও সর্দি-কাশির রোগী ৮৪০ জন। ৮০ শতাংশই জ্বর ও সর্দি-কাশির রোগী। ওই ৮৪০ জনের মধ্যে নমুনা দিয়েছেন ১৯৮ জন। করোনা শনাক্ত হয় ৮৭ জনের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা সদরের কলাদী এলাকার এক তরুণ বলেন, ‘ছয়-সাত দিন ধইরা জ্বর ও সর্দি-কাশিতে ভুগতাছি। লগে হাঁচি-কাশিও আছে। আমাগো পরিবারের আরও তিন-চারজনেরও একই অবস্থা। সাধারণ জ্বর মনে কইরা নমুনা দিতাছি না। এক চিকিৎসকের কাছে গেছিলাম। ব্যবস্থাপত্র দিয়া হেয় নমুনা দিতে কইছিলেন। নমুনা দেই নাই। করোনা ধরা পড়লে নানা ঝামেলা-ঝক্কি অইব। বাসায় ওষুধপত্র খাইতাছি। ভালা অইয়া যাইব।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলাদী, নবকলস, ঘোষপাড়া, ঢাকিরগাঁও, চরমুকন্দি, ভাঙাররপাড়, দশপাড়াসহ উপজেলার আরও কয়েকটি এলাকায় কয়েক দিন ধরে ঘরে ঘরে লোকজনের জ্বর। অসুস্থতা চেপে অনেকে নিজেই নিজের চিকিৎসা করছেন। পরিবারের সদস্য ও বাইরের লোকজনের সঙ্গে মিশছেন। নমুনা পরীক্ষাও করাচ্ছেন না।

কলেজশিক্ষক কামাল হোসেন বলেন, করোনার উপসর্গ থাকলে নমুনা পরীক্ষা না করে অবাধে চলাফেরা করলে সংক্রমণের হার ও ঝুঁকি বাড়বে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রাজিব কিশোর বণিক বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিন অনেক লোক জ্বর ও সর্দি-কাশি নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নমুনার কথা বললে দ্রুত কেটে পড়ছেন। উপসর্গ নিয়ে হাটবাজারে ঘুরছেন। টিকা নেওয়ার আগ্রহ বাড়লেও লোকজনের মধ্যে নমুনার আগ্রহ বাড়েনি। এতে সংক্রমণের হার ও ঝুঁকি বাড়ছে। নমুনা পরীক্ষায়, টিকা গ্রহণ ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে সবাইকে আগ্রহী হতে হবে। অন্যথায় করোনা ঠেকানো কঠিন হবে।