default-image

আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক সাংসদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের পরিচালক মরহুম মির্জা আবদুল লতিফের নাম ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় রয়েছে। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা অবিলম্বে রাজাকারের তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহার এবং জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

গত ১৫ নভেম্বর প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী বিভাগের ক্রমিক নম্বর ৩৪, পূর্বের নথির নম্বর ৯৬, নথি নম্বর-২৩৪/৭২, রাজাকারের নাম ও ঠিকানায় লেখা রয়েছে, ‘পাবনা জেলার চৌহালী ও শাহজাদপুর থানার তাঁত মালিকদের পক্ষ হতে মো. জহুরুল ইসলাম মোল্লা কর্তৃক মির্জা আবদুল লতিফ ও অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ’। মন্তব্য কলামে লেখা রয়েছে, ‘অভিযোগ নথিতে নেই, মূল কপি পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রেরণ’ উল্লেখ রয়েছে।

তালিকায় আবদুল লতিফ মির্জার নাম থাকায় পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের সাত শতাধিক মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণার সৃষ্টি হয়েছে। যুবশিবিরের সহ–অধিনায়ক সাবেক সাংসদ গাজী ম ম আমজাদ হোসেন তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছি! ছি! ছি!, পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের পরিচালক যদি রাজাকার হয়, তাহলে আমরা কী?’

সিরাজগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার শফিকুল ইসলাম জানান, সিরাজগঞ্জের প্রায় ৫০ থেকে ৫২ জন রাজাকারের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক মির্জা আবদুল লতিফসহ আরও দু-একজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর প্রতিবাদ জানানোর ভাষা নেই। তিনি বলেন, ‘আমরা আজকের মধ্যেই মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বৈঠক করে প্রতিবাদ শুরু করব।’

আবদুল লতিফের মেয়ে আওয়ামী লীগের নেত্রী সেলিনা মির্জা বলেন, ‘আমরা পরিবারের সবাই বাক্‌রুদ্ধ। আমরা হতবাক। ধিক্কার জানাই, যারা তালিকা তৈরি করেছে।’ সেলিনা মির্জা বলেন, মির্জা আবদুল লতিফের পরিবারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বড় ধরনের চক্রান্তের অংশ হিসেবে এ কাজ করা হয়েছে। তিনি চক্রান্তকারীদের শাস্তির দাবি জানান।

মুক্তিযুদ্ধকালীন পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের কমান্ড ইনচার্জ সোহরাব আলী প্রথম আলোকে জানান, ১৯৭১ সালের ২৪ এপ্রিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর একটি দল পাবনার ঈশ্বরদী থেকে ট্রেনে করে সিরাজগঞ্জে আসার পথে উল্লাপাড়া ঘাটিনা রেলওয়ে সেতুর কাছে প্রথম প্রতিরোধে মুখে পড়ে। তুখোড় ছাত্রনেতা ও সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ সংসদের সাবেক ভিপি মির্জা আবদুল লতিফের নেতৃত্বে তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা সম্মুখযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পরাজিত হয়ে পিছু হটে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। আর এ যুদ্ধটি সিরাজগঞ্জের প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধ হিসেবে স্বীকৃত। এ যুদ্ধের পরই লতিফ মির্জাসহ মহুকুমা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রশিক্ষণ নিতে ভারতে চলে যান। ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুক্ত হন আবদুল লতিফ মির্জাসহ ২০–২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা। দাঁড়িয়ে যায় একটি বেসামরিক বাহিনী।

৬ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে এই বাহিনীর নামকরণ করা হয় ‘পলাশডাঙ্গা যুবশিবির’। সবার সম্মতিক্রমে আবদুল আজিজ সরকার এই নামকরণ করেন। মির্জা আবদুল লতিফকে পরিচালক, রাকসুর সাবেক জিএস আবদুস সামাদ ও মনিরুল কবিরকে সহকারী পরিচালক ও সিরাজগঞ্জ কলেজের ভিপি সোহরাব আলীকে অধিনায়ক (কমান্ড ইনচার্জ) নিযুক্ত করা হয়। দীর্ঘ নয় মাস মির্জা আবদুল লতিফ বিশ্বাসের নেতৃত্বে বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। একাত্তরে উত্তরবঙ্গে যে কয়টা যুদ্ধ সংঘটিত হয়, তার মধ্যে   অন্যতম সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ যুদ্ধ। ১১ নভেম্বরের এ যুদ্ধে নিহত হয় হানাদার বাহিনীর শতাধিক সেনা। অন্যদিকে পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

সেদিন ভোর না হতেই ২৫ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ২৫০ সেনা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হান্ডিয়াল নওগাঁ মাজারের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থান নেয়। আগাম খবর পেয়ে চলনবিলের বুকে ভাসমান নৌকায় অবস্থান নেন মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েন শত্রুসেনাদের ওপর। দুপুর ১২টার দিকে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হলে মুক্তিবাহিনী হানাদারদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। নিহত হয় শতাধিক শত্রুসেনা। এ দিন বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী এলাকায় প্রায় ৭০ জন রাজাকারকে পিটিয়ে মারেন। পুরো যুদ্ধের নেতৃত্বে দেন মির্জা আবদুল লতিফ।

মির্জা আবদুল লতিফ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বংকিরহাট এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও তিনি সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় ২০০৭ সালে ৫ নভেম্বর মারা যান।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0