default-image

মধু মিয়ার (৬২) ঘরে এখনো হাঁটুপানি। এক ছেলেকে নিয়ে তিনি আছেন ঘরে। ঘরের জিনিসপত্র, হাঁস-মুরগি দেখাশোনার জন্যই দুজন থাকছেন। পরিবারের অন্যরা ১১ দিন ধরে আছেন এক আত্মীয়বাড়িতে।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হাসনবসত গ্রামের বাসিন্দা মধু মিয়া বলেন, ‘আমরার ভোগান্তির শেষ নাই। অত লম্বা বন্যা আগে দেখছি না। ঘর থাকি পানি নামার নাম নেই। পানি ঝিম ধরি আছে। যাইত খরি খর না।’

সুনামগঞ্জে গত চার দিন ভারী বৃষ্টি হয়নি। একই সময় উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নেমেছে কম। যে কারণে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। জেলার প্রধান নদী সুরমার পানি কমছে। তবে হাওরে পানি কমছে ধীরে। যে কারণে মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটে এখনো রয়েছে বন্যার পানি। বন্যা দীর্ঘায়িত হওয়ায় বাড়ছে পানিবন্দী মানুষের ভোগান্তি।

জেলা সদরের কালীপুর এলাকার বাসিন্দা ছবর আলী (৩৮) বলেন, ‘ঘরের বাইরে পরিবার-পরিজন নিয়া খয়দিন থাকা যায়। পয়লা বন্যাত থাকছি আট দিন। অখন আরও পাঁচ দিন অইগিছে। পানি ত নামছে না। বড় অভাবে আছি। কোনো কাজখাম নাই। খাইয়া, না খাইয়া দিন যায়।’

সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে আশ্রয় নিয়েছে পাশের সুলতানপুর, আপ্তাবনগর, পাঠানবাড়ী, হাসননগর এলাকার চার শতাধিক পরিবার। এই প্রতিষ্ঠানের ৩২টি কক্ষে গাদাগাদি করে আছে বন্যার্ত লোকজন। অনেকেই ঘরের গবাদিপশু নিয়ে এসেছে এখানে। আপ্তাবনগর গ্রামের কলুমা বেগম বলছিলেন, ‘১৮ দিন ধরি আছি। মাঝখানে ঘর থাকি পানি নামছিল। বাড়িত যাইতাম, এর মাঝে আবার পানি আইছে। এর লাগি আর যাইতাম পারছি না। ঘর থাকি পানি না গেলে ইকানো থাকত অইব।’ এই আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা রাজমিস্ত্রি সোহেল মিয়া (৪০) বলেন, ‘একটা কোঠাত ১৫-২০টা পরিবার আছে। থাকা-খাওয়ার সমস্যা তো আছেই। বড় সমস্যা অইল পানি আর ল্যাট্রিনের।’ একই এলাকার আরেক বাসিন্দা বোরহান উদ্দিন (৫০) জানান, এখানে যারা আছে, সবার ঘরেই কমবেশি বন্যার পানি রয়েছে। পানি কমছে ধীরে। তাই কেউ বাড়িঘরে যেতে পারছে না।

জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু হেনা আজিজ বলেন, হাওরের পানি কমছে, তবে সেটা খুবই কম। তাই মানুষের বাড়িঘর থেকে পানি নামছে না। বেশি দিন ঘরে পানি থাকায় মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

সুনামগঞ্জে দুই দফা বন্যায় মানুষজন চরম ভোগান্তিতে আছে। জেলায় প্রথম দফা বন্যা দেখা দেয় গত ২৫ জুন। এই বন্যার পানি নামতে না নামতেই আবার ১০ জুলাই বন্যা দেখা দিয়েছে। জেলার সব কটি উপজেলাই এখন বন্যাকবলিত। জেলার সদর, তাহিরপুর, ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জামালগঞ্জ ও দোয়ারাবাজার উপজেলা বন্যাকবলিত বেশি। এসব এলাকার রাস্তাঘাট ও বাড়িঘরে এখনো বন্যার পানি রয়েছে। বন্যার পানিতে সড়ক প্লাবিত ও ক্ষতি হওয়ায় জেলা সদরের সঙ্গে এখনো সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার ও ছাতক উপজেলার। বন্যার পানিতে ভেসে গেছে জেলার প্রায় তিন হাজার পুকুরের মাছ। এতে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন মাছচাষিরা।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার জহিরুল আলম বলেন, সুনামগঞ্জে বন্যায় ১ লাখ ৭ হাজার ৭২৯টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১৩৩টি পরিবার রয়েছে। জেলায় এ পর্যন্ত ত্রাণসহায়তা হিসেবে ৮৬৫ মেট্রিক টন চাল, নগদ ৪৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা, ১ হাজার ৯০০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ২ লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও ২ লাখ টাকার গোখাদ্য বিতরণ করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি উপজেলায় ত্রাণ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনা খাবার দেওয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নেমে এসেছে। পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ১৯ জুলাই পর্যন্ত সুনামগঞ্জে ভারী বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই এ সময় জেলার বন্যার পরিস্থিতির আর অবনতি হবে না। তবে ২০ জুলাই থেকে আবার বৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0