default-image

হরতাল চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় দুপুর সোয়া ১২টা। বিকেল ৫টা ১০ মিনিটে আবার গিয়ে দেখা যায়, তখনো ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত চারপাশ। কিছুটা দূরে পৌরসভা কার্যালয় ও সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তন। পোড়া গন্ধ বের হচ্ছিল ওই দুই প্রতিষ্ঠান থেকেও। হামলাকারীদের থাবা থেকে রেহাই পায়নি প্রেসক্লাবও।

সুরের শহর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্থানে স্থানে এখন স্পষ্ট হরতাল–সমর্থকদের হামলার ক্ষতচিহ্ন। শুধু তা–ই নয়, জেলা শহরের বাইরে তাণ্ডব চলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুর আশুগঞ্জ প্রান্তের টোল প্লাজা। একই স্থানের পুলিশ বক্সেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার সূত্র ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯ জন। এর মধ্যে হরতাল চলাকালে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তিনজনের মধ্যে একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের। অন্য দুজন মারা যান একই জেলার সরাইলে।

হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতাল চলাকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজপথ প্রথম সরগরম হয় সকাল সোয়া ৮টায়। ওই সময়ে শতাধিক হরতাল–সমর্থক শহরের কান্দিপাড় থেকে মিছিল নিয়ে প্রেসক্লাবে গিয়ে থামেন। ওই স্থানে পথসভা করেন।

বিজ্ঞাপন

সকাল ৯টার পর পরিস্থিতি নাজুক পর্যায়ে যেতে শুরু করে। হেফাজতের সমর্থকেরা শহরের ভাদুঘর, টি এ রোড, কালীবাড়ি মোড়, বিরাসার, মেড্ডার পীরবাড়ি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। এরপর চালানো হয় একের পর এক হামলা। হামলাগুলো হয় সকাল ৯টার পর থেকে বেলা ৩টার মধ্যে। তাঁদের হামলার প্রথম লক্ষ্যবস্তু হয় জেলা পুলিশ লাইনস। হামলাকারী সংখ্যায় ছিলেন কয়েক শ। হাতে ছিল লাঠি, রড ও শাবল। হামলাকারীরা পুলিশ লাইনসে ঢুকতে পারেননি। তবে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়ে মারেন। পুলিশের সঙ্গে তাঁদের দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় ৪০-৪৫ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি আহত হন। তিনি দুপুরে হাসপাতালে মারা যান।

হামলাকারীরা বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কার্যালয়ের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে গিয়ে ভাঙচুর চালান। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হরতাল–সমর্থকেরা থানা ভবনের সামনে এসে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। বেলা সোয়া ১১টার দিকে বড় হামলার শিকার হয় জেলা পরিষদ কার্যালয়। কার্যালয়টির নিচতলা থেকে ওপর তলায় আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনে পুড়ে যায় একটি সরকারি জিপ, আসবাব, কম্পিউটারসহ নথিপত্র। কাছাকাছি সময়ে হারতাল–সমর্থকেরা হানা দেন জেলা পরিষদ লাগোয়া রেলক্রসিং গেট।

বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে জেলা শিল্পকলা একাডেমির এবং লাগোয়া ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত ভাষাচত্বর হামলার শিকার হয়। সেখানে তখন উন্নয়ন মেলা চলছিল। হারতাল–সমর্থকেরা অন্তত ৩০টি স্টল ভাঙচুর করেন এবং আগুন লাগিয়ে দেন। চত্বরে ভেতরে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের ব্যক্তিগত কার্যালয়ের তিনটি কক্ষ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে প্রধান ফটক ভেঙে শিল্পকলা একাডেমিতে ঢোকেন হারতাল–সমর্থকেরা। শিল্পকলার বাদ্যযন্ত্র, আসবাব, সাউন্ড সিস্টেম বাইরে এনে আগুন ধরিয়ে দেন।

পৌরসভা কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। নিচতলার গাড়ির গ্যারেজে থাকা দুটি সরকারি গাড়িতে আগুন দেওয়ার পর দ্বিতীয় তলায় মেয়র নায়ার কবিরের কক্ষ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তৃতীয় তলায় অবস্থিত অন্যান্য দপ্তরেও আগুন দেওয়া হয়। হরতাল–সমর্থকেরা সবচেয়ে বেশি তাণ্ডব চালান সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ পৌর মিলনায়তনে। হারতাল–সমর্থকদের দেওয়া আগুনে পাঁচ শতাধিক স্টিলের চেয়ার, মঞ্চসহ সব আসবাব পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

কাছাকাছি সময়ে আগুন দেওয়া হয় সুরসম্রাট দ্য আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনে। আগুনে সেখানকার জাদুঘর, বাদ্যযন্ত্র, মিলনায়তন, শ্রেণিকক্ষ ও অফিস কার্যালয় পুড়ে যায়। সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয় পুড়ে দুপুর সাড়ে ১২টায়। দুই শতাধিক হরতাল–সমর্থক ভেতরে গিয়ে প্রথমে নথিপত্রে পেট্রল ঢালেন। পরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। শহরের ট্যাংক পাড়ে অবস্থিত পানি উন্নয়ন বোর্ডে হরতাল–সমর্থকেরা ঢোকেন বেলা ১টার দিকে। তাঁরা সেখানে একটি রেস্টহাউস ও দুটি ভবনে আগুন ধরিয়ে দেন।

জেলা গণগ্রন্থাগার আগুনে পুড়ে বেলা দেড়টার দিকে। আগুনে গ্রন্থাগারের কিছু আসবাব ও কিছু বই পুড়ে যায়। তবে স্থানীয় ব্যক্তিরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রেসক্লাব হামলার শিকার হয় দুপুর ১২টার দিকে। একদল হরতাল–সমর্থক প্রথমে ইটপাটকেল ছুড়ে দুইতলা ভবনের কাচের প্রাচীর ভেঙে ফেলেন। এ সময় প্রেসক্লাবের সভাপতি রিয়াজ উদ্দিন এগিয়ে আসেন। তখন তিনি হরতাল–সমর্থকদের হামলার শিকার হন। তিনি মাথায় আঘাত পান। তাঁর মাথায় ছয়টি সেলাই দিতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়, জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, হালদারপাড়া কালীবাড়ি মন্দির ও ব্যাংক এশিয়া কার্যালয়ে ভাঙচুর চলে। জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবুল বারী চৌধুরী, বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়ার ব্যক্তিগত কার্যালয়, কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান প্রয়াত আফজল হোসেন চৌধুরী, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রবিউল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন ও পৌরসভার মেয়র বাসভবনের নিচতলার একটি দোকান ও দ্বিতীয় তলায় মেয়রের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন