বিজ্ঞাপন

ওই খুশির কারণও আছে। করোনা হাসপাতালে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বয়স্ক। অধিকাংশের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ওই হাসপাতালে প্রতিদিনই কমপক্ষে পাঁচজন করোনায় আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন। আর করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যাও কম নয়। হাসপাতালে ভর্তি থেকে এসব সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন আবদুল মালেক ও তাঁর স্বজনেরা।

ইজিবাইকে বসেই বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলেন আবদুল মালেক। বললেন, ‘হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারব বলে কখনো আশা করিনি। আশপাশের মানুষের মৃত্যু দেখে মনটা খারাপ হয়ে যেত। তখন মনে হতো, আমারও হয়তো এমন হবে। তবে আল্লাহ এ যাত্রায় হয়তো বাঁচিয়ে দিয়েছেন। বাড়ি যেতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।’
আবদুল মালেকের ডায়াবেটিসসহ নানা শারীরিক জটিলতা ছিল। তাই যমের মুখ থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আনন্দ স্ত্রী হাসিনা বেগম ও নাতি জামাই মো. মিরান মল্লিকের মুখেও। হাসিনা বেগম বলেন, গত মাসের ২৭ অথবা ২৮ তারিখের দিকে হঠাৎ শরীরে জ্বর আসে আবদুল মালেকের। প্রথম দিকে এটিকে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু ১ জুলাই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এরপর মাইক্রোবাসে করে বাড়ি থেকে সরাসরি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাঁরা। উপসর্গ থাকায় করোনা হাসপাতালের ইয়োলো জোনে ভর্তি করা হয়। নমুনা পরীক্ষা করে দেখা যায়, করোনা পজিটিভ। এরপর রেড জোনে ভর্তি করে তাঁর করোনার চিকিৎসা চলে। প্রথম থেকেই শ্বাসকষ্ট ছিল, তাই সব সময় অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন হতো। যে পরিস্থিতি ছিল, তাতে কখনো ভাবতেই পারেননি যে মানুষটিকে আবার বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন।

মিরান মল্লিক বলেন, এখন মালেককে নগরের পাশে বটিয়াঘাটা উপজেলার চক্রাখালী গ্রামে তাঁর মেয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেখানে এক বা দুদিন রেখে তারপর বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

যুদ্ধে হেরে গেলেন শুক্লা গোলদার

আবদুল মালেকের ঠিক এক ঘণ্টা পরই ওই হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে আসা হয় একটি স্ট্রেচার। তাতে কাঁথা মুড়িয়ে রাখা একটি মরদেহ। পাশেই আহাজারি করছেন স্বজনেরা। মরদেহটি ৪৫ বছর বয়স্ক শুক্লা গোলদারের। বাড়ি বটিয়াঘাটার সাচিবুনিয়া গ্রামে। শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত সোমবার তাঁকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

শুক্লা গোলদারের ছেলে রথিন গোলদার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘সুস্থ একজন মানুষ চোখের সামনে কীভাবে মারা যেতে পারেন, তা বিশ্বাসই করতে পারছি না। অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু মাকে বাঁচাতে পারিনি। এখন রূপসা শ্মশানে নিয়ে মায়ের লাশ সৎকার করতে হবে।’

সেখানে থাকা অন্য স্বজনেরা বলেন, কয়েক দিন আগে শুক্লা গোলদারের জ্বর হয়। এরপর শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। বাড়িতেই চিকিৎসা চলছিল। অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছিল ‘খুলনা অক্সিজেন ব্যাংক’ থেকে। তবে সোমবার সকালের দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে ফুরিয়ে যায় অক্সিজেন। তা ছাড়া ভর্তি হতেও কিছুটা সময় লাগে। সব মিলিয়ে ওই সময়ের মধ্যেই অনেকটা শক্তি হারিয়ে ফেলেন শুক্লা গোলদার। হাসপাতালের আইসিইউতে রেখে চিকিৎসা চলছিল। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয়নি।
কাকতালীয় হলেও এটাই সত্যি যে শুক্লা গোলদারের মরদেহ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি যখন যাত্রা শুরু করে, তখনো হাতের ঘড়িটির কাটা ২টা ১০ মিনিট ছুঁই ছুঁই। এমনভাবেই ১৩০ শয্যাবিশিষ্ট করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতাল থেকে বের হচ্ছেন রোগীরা। তবে কেউ হাসিমুখে আর কেউ স্বজনদের কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিয়ে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন